অনলাইন সীমান্তবাণী ডেস্ক : বাংলাদেশে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া সাধারণ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজপথের প্রচারণার পাশাপাশি ভার্চুয়াল জগতে এক নজিরবিহীন লড়াই শুরু হয়েছে
বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) থেকে সরাসরি নির্বাচনী প্রচারণা শুরুর কথা থাকলেও বড় রাজনৈতিক দলগুলো গত কয়েক মাস ধরেই ফেসবুক, ইউটিউব এবং টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্মগুলোকে প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।
বিশেষ করে ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া ‘জেন-জি’ বা তরুণ ভোটারদের আকৃষ্ট করতেই এই ডিজিটাল লড়াই তীব্র হয়ে উঠেছে। আল-জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে মূল লড়াই এখন বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোটের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে।
ডিজিটাল এই লড়াইয়ের বড় একটি অংশ জুড়ে রয়েছে রাজনৈতিক সংগীত বা এনথেম। সম্প্রতি জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে একটি গান সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক ভাইরাল হয়েছে, যেখানে নৌকা, ধানের শীষ এবং লাঙ্গল—পুরানো এই রাজনৈতিক প্রতীকগুলোকে প্রত্যাখ্যান করে ‘দাঁড়িপাল্লা’ বা নতুন আগামীর কথা বলা হয়েছে।
লন্ডনভিত্তিক চলচ্চিত্র নির্মাতা এইচএএল বান্না, যিনি এই গানটি তৈরি করেছেন, তিনি জানিয়েছেন যে এটি মূলত একজন প্রার্থীর জন্য করা হলেও সাধারণ ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলায় অন্য প্রার্থীরাও এই ধরণের গান ব্যবহার শুরু করেছেন। এর বিপরীতে বিএনপিও তাদের ‘আমার আগে আমরা, আমাদের আগে দেশ’ স্লোগান নিয়ে পাল্টা প্রচারণামূলক গান ও ভিডিও প্রকাশ করেছে। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং অন্যান্য দলগুলোও পিছিয়ে নেই, তারা ছোট নাটিকা, নীতি ব্যাখ্যা এবং ব্যঙ্গাত্মক ভিডিওর মাধ্যমে ভোটারদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছে।
বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা এবং তরুণ ভোটারদের আধিক্যই এই ডিজিটাল প্রচারণার মূল কারণ। বিটিআরসি-র তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত দেশে প্রায় ১৩ কোটি ইন্টারনেট ব্যবহারকারী ছিল, যা মোট জনসংখ্যার ৭৪ শতাংশ। এছাড়া ডেটারিপোর্টাল-এর তথ্যমতে, বাংলাদেশে ৬ কোটি ৪০ লাখ ফেসবুক ব্যবহারকারী এবং ৫ কোটি ৬০ লাখ টিকটক ব্যবহারকারী রয়েছেন।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ভোটারদের ৪৩ দশমিক ৫৬ শতাংশের বয়স ১৮ থেকে ৩৭ বছরের মধ্যে, যাদের একটি বড় অংশ এবারই প্রথম ভোট দেবেন। বিগত কয়েকটি নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ায় এবং গণতান্ত্রিক অধিকার থেকে বঞ্চিত বোধ করায় তরুণদের মধ্যে এবার ভোট দেওয়ার বিষয়ে তীব্র আকাঙ্ক্ষা দেখা যাচ্ছে, যা রাজনৈতিক দলগুলোকে সোশ্যাল মিডিয়ায় আরও সক্রিয় করে তুলেছে।
রাজনৈতিক দলগুলো তাদের নির্বাচনী ইশতেহার তৈরিতেও ডিজিটাল প্রযুক্তির সাহায্য নিচ্ছে। বিএনপি ‘ম্যাচমাইপলিসি ডটকম’ নামে একটি ওয়েবসাইট চালু করেছে যেখানে ভোটাররা তাদের প্রস্তাবিত নীতির ওপর মতামত দিতে পারছেন। একইভাবে জামায়াতে ইসলামীও ‘জনতার ইশতেহার’ নামে একটি সাইট খুলেছে জনগণের দাবিগুলো জানার জন্য।
অন্যদিকে, অন্তর্বর্তী সরকার ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বা সংস্কার প্যাকেজের ওপর একটি গণভোটেরও আয়োজন করেছে। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম জানিয়েছেন, প্রথাগত গণমাধ্যমের চেয়ে সোশ্যাল মিডিয়া এখন বেশি প্রভাবশালী হওয়ায় তারা সেখানেও সরকারিভাবে ‘হ্যাঁ’ ভোটের প্রচার চালাচ্ছেন। রাজপথের প্রচারণা শুরু হলেও বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এবারের নির্বাচনের ভাগ্য মূলত নির্ধারিত হতে পারে সোশ্যাল মিডিয়ার এই বুদ্ধিদীপ্ত লড়াইয়ের মাধ্যমেই। সূত্র: আল জাজিরা