১৮ জানুয়ারী ২০২২, ০১:০০ অপরাহ্ন

১. মহান আল্লাহ্ তা’আলা বলেছেন, ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ হলো আমার দূর্গ। যে ব্যাক্তি তাতে প্রবেশ করেছেন, সে আমার শাস্তি থেকে নিরাপদ হয়েছে। ইবনুন নাজ্জার হযরত আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু সূত্রে আলোচ্য হাদীসখানা বর্ণনা করেছেন।
২. মহান আল্লাহ্ তা’আলা বলেন, আমি আল্লাহ্, আমি ছাড়া কোন উপাস্য (সত্য মা’বুদ) নেই, এ উক্তি আমার, যে এটা মেনে নিবে আমি তাকে আমার জান্নাতে (বেহেশতে )প্রবেশ করাব, আর যাকে আমি আমার জান্নাতে প্রবেশ করাই, সে নিশ্চয়ই আমার শাস্তি থেকে নিরাপদ হয়। আল-কোরআন আমার বাণী। আর আমার নিকট থেকেই তা নাযিল হয়েছে। হযরত খাতীব আলোচ্য হাদীসখানা আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু সূত্রে বর্ণনা করেছেন।
৩. মুসলমান বান্দা যখন “ লা-ইলাহা ইল্ল­াল্লাহু ” বলে, তখন তা আকাশসমুহ ভেদ করে যায়, এমনকি তা আল্ল­াহর সামনে অবস্থান করে। তারপর আল্ল­াহ তায়ালা বলেন, “তুমি স্থির হও” , তখন এটা বলে,  “আমি স্থির হবো কিভাবে- আমি যার দ্বারা উচ্চারিত হয়েছি এখন পর্যন্ত তাকে ক্ষমা করা হয়নি”। তখন আল্ল­াহ তায়ালা বলেন , আমি তোমাকে সে ব্যাক্তির যবান দ্বারা চালিত করি নাই যাকে তার পুর্ব মূহুর্তেই ক্ষমা করে দেই নাই। হযরত দায়লামী আলোচ্য হাদীসখানা হযরত আনাস (রা)-এর সূত্রে রেওয়ায়েত করেছেন।
৪. তোমাদের  রব (আল্ল­াহ) বলেছেন, আমাকেই সকলে ভয় করবে। কারণ আমিই এটার উপযুক্ত; অতএব আমার সাথে অন্য কাউকেও যেন ইলাহ তথা উপাস্য স্থির করা না হয়। অতঃপর যে ব্যাক্তি আমার সাথে অন্য কাউকেও উপাস্য করবে না- অনুগ্রহবশত আমি তাকে ক্ষমা করে দেওয়া একান্ত কর্তব্য মনে করি। আহমদ ও তিরমিযী, আলোচ্য হাদীসখানা হযরত আনাস (রা)- এর সূত্রে রেওয়ায়েত করেছেন।
৫. মহান আল্ল­াহ তায়ালা বলেছেন, নিশ্চয়ই আমি জিন এবং মানুষ নিয়ে এক মহা পরিস্থিতিতে আছি। আমি তাদেরকে সৃষ্টি করি, আর তারা আমাকে ছাড়া অন্যের ইবাদত করে, আমি তাদেরকে রিযিক দিই, আর তারা আমাকে ছাড়া অন্যের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। হাকেম ও তিরমিযী আলোচ্য হাদীসখানা হযরত আবু দারদা (রা)-এর সূত্রে রেওয়ায়েত করেছেন।
৬. মহান আল্ল­াহ তা’আলা মুসা ইবনে ইমরানের প্রতি ওহী অবতীর্ণ করলেন যে, তাঁর উম্মতের মধ্যে কতিপয় মানুষ এরূপ হবে যে, তারা (ভ্রমনে) উঁচু নিচু স্থানে উঠতে নামতে ‘লা- ইলাহা ইল­াল­াহ’ স্বাক্ষ্য দান করতে থাকবে, তাদের জন্য নবীর অনুরূপ প্রতিদান রয়েছে। দায়লামী আলোচ্য হাদীসখানা হযরত আনাস (রা)-এর সূত্রে রেওয়ায়েত করেছেন।
৭. যখন হযরত মূসা (আ)-কে তাওরাত কিতাব দেওয়া হয় তখন মুসা (আঃ) তার মহান প্রভুকে অনুরোধ কররেন যে, তাকে যেনো এরূপ একটি দু’আ শিক্ষা দেওয়া হয় যা দ্বারা আল্ল­াহ তা’আালাকে তিনি ডাকতে পারেন। তারপর আল্ল­াহ তাা’আলা তাকে ‘লা- ইলাহা ইল­াল­াহ’ বাক্যের মাধ্যমে আহ্বান করতে আদেশ করলেন। তখন হযরত মূসা (আ) বললেন , হে আমার প্রভু তোমার প্রত্যেক বান্দাই এ বলে তোমাকে আহ্বান করে থাকে। আমি চাই যেনো তুমি আমাকে বিশেষ দু’আ শিক্ষা দাও যার মাধ্যমে তোমাকে আমি ডাকতে পারি। অতঃপর আল্ল­াহ তা’আলা বললেন, হে মূসা যদি সপ্ত আকাশ ও এর অধিবাসীগণ, সমুদয় পৃথিবী ও এর অধিবাসীগণ এবং সমস্ত সাগর ও এতে যা কিছু আছে সব দাঁড়িপাল­ার একপাশে রাখা হয়, আর ‘লা- ইলাহা ইল্ল­াল্লাহু দাঁড়িপাল্লার অপর পাশে রাখা হয়, তা হলে নিশ্চয় ‘লা- ইলাহা ইল্লাল্লাহ’র ওজন বেশী হবে। আবু ইয়া’লা আলোচ্য হাদীসখানা হযরত আবু সাঈদ (রা)-এর সূত্রে রেওয়ায়েত করেছেন।
৮. তোমাদের প্রতিপালক বলেছেন, যদি আমার বান্দাগণ আমার আদেশ পূর্ণমাত্রায়  পালন করত তা হলে আমি নিশ্চয়ই রাতের বেলা তাদেরকে বৃষ্টি দান করতাম, দিনে তাদের জন্য রৌদ্র উঠাতাম এবং তাদেরকে বজ্রের আওয়াজ শুনাতাম না। ইমাম আহমেদ ও হাকেম হযরত আবু হুরায়রা (রা) – এর সূত্রে আলোচ্য হাদীস খানা রেওয়ায়েত করেছেন।
৯. নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্ল­াম ইরশাদ করেন, যখন মি’রাজের রাতে আমাকে আকাশে নিয়ে যাওয়া হয়, আমি জান্নাতে প্রবেশ করলাম । অতঃপর আমি দেখলাম , আরশের ডান পাশে লেখা রয়েছে “ লা – ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রসুলুাল্লাহ।” আমি তাকে [হযরত মুহম্মদ সল্লাল্লাহু­ আলাইহি ওয়া সাল্ল­াম- কে] উচ্চ মর্যাদার অধিকারী করেছি এবং সাহায্য দান করেছি। তিবরানী আলোচ্য হাদীসখানা হযরত আবুল হামরা  (রা) থেকে রেওয়ায়েত করেছেন।
১০. জান্নাতীরা জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং জাহান্নামীরা জাহান্নামে প্রবেশ করবে। অতঃপর মহান পরাক্রমশালী আল্ল­াহ তা’য়ালা বলবেন, যার অন্তরে একটি সরিষার দানা পরিমান ঈমান বিদ্যমান আছে তাকেও (জাহান্নাম থেকে) বের করে নিয়ে আস। অতঃপর তাদেরকে তা থেকে বের করে আনা হবে। তারা তখন কালো রং ধারণ করবে। তখন তাদেরকে আবেহায়াতে নিক্ষেপ করা হবে,  তখন তারা এভাবে সঞ্জীবিত হয়ে উঠবে যেভাবে জলার ধারে বীজ গজিয়ে ওঠে। তুমি কি দেখ নাই যে, উহা কেমন হলুদ হয়ে গজিয়ে ওঠে। শাইখাইন (ইমাম বোখারী ও ইমাম মুসলিম) আলোচ্য হাদীনখানা আবু সাঈদ (রা) সূত্রে বর্ণনা করেছেন।

 

হাদীসে কুদসী মহান আল্লাহর বাণী / তাওহীদ সম্পর্কে হাদীসে কুদসীসমূহ (বাংলা অর্থ)

১. মহান আল্ল­াহ্ তা’আলা বলেছেন, যাদেরকে আমার অংশীদার স্থির করা তাদের সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই। যে ব্যাক্তি কোন আমল এবং এতে আমার সাথে (কাউকে বা কোন কিছুকে) অংশীদার স্থির করে আমি তাকে পরিত্যাগ করি এবং সে যা আমার সাথে অংশীদার স্থির করে একেও আমি অগ্রাহ্য করি। – মুসলিম ও ইবনে মাজাহ হযরত আবু হুরায়রা (রা) থেকে আলোচ্য হাদীসখানা রেওয়ায়েত করেছেন।

২. মর্যাদাবান আল্র­াহ্ তা’য়ালা বলেছেন, যে ব্যাক্তি এ বিষয়ে জ্ঞান রাখে যে, আমি যাবতীয় অপরাধ ক্ষমা করে দেওয়ার অধিকারী। আমি তাকে ক্ষমা করে দিই। আর আমি কোন দোষ ধরি না, যে পর্যন্ত সে আমার সাথে কোন কিছুকে অংশিদার না করে। – তিবরানী ও হাকেম আলোচ্য হাদীসখানা হযরত আব্দুল­াহ ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণনা করেছেন।

৩. মহান মর্য়াদাবান আল্ল­াহ্ তা’য়ালা বলেছেন, হে বনী আদম! যে পর্যন্ত তুমি আমার ইবাদত কর এবং আমার নিকট আশা পোষণ কর, আর আমার সাথে কোন অংশিদার না কর , সে পর্যন্ত তোমার সকল পাপ আমি মোছন করে দিই। আর যদি তুমি সপ্ত আকাশ পূর্ণ অপরাধ ও গুনাহ্ নিয়ে আমার দিকে অগ্রসর হও, আমি তদনুরূপ ক্ষমা নিয়ে তোমার দিকে অগ্রসর হই এবং তোমাকে ক্ষমা করি।

৪. কিয়ামতের দিন জাহান্নামীদের কোন এক ব্যাক্তিকে জিঞ্জাসা করা হবে, তুমি কি মনে কর তোমার নিকট যদি দুনিয়ার কোন বস্তু থাকতো তবে তুমি তা মুক্তির জন্য বিনিময় হিসেবে দান করতে? তখন জবাবে সে বলবে, হ্যাঁ। তখন আল­াহ বলবেন,      -আমি তোমার নিকট এর চেয়েও সামান্য কিছু চেয়েছিলাম। আদমের পৃষ্ঠে থাকাকালে তোমার নিকট চেয়েছিলাম যে, তুমি আমার সাথে কোন কিছু অংশিদার স্থির করবে না। তখন তুমি অংশিদার স্থির না করার ওয়াদা করেছিলে। – আহমদ ও শায়খাইন আবু আওয়ানা ও ইবনে হাব্বান হযরত আনাস (রাঃ) থেকে আলোচ্য হাদীসখানা বর্ণনা করেছেন।

৫. মহান আল্র­াহ তা’আলা বলেছেন, নিশ্চয়ই তোমাদের সকল উম্মত (তর্কচ্ছলে) সব সময় বলতে থাকবে এটা হলো কিভাবে ? এমনকি ‘শেষে বলবে, (আচ্ছা) “আল­াহ তা’আলা এ সৃষ্টিকুলকে সৃষ্টি করেছেন; কিন্তু আল­াহকে  কে সৃষ্টি করেছে ?”- ইমাম মুসলিম ও আবু আওয়ানা হযরত আনাস (রাঃ) থেকে আলোচ্য হাদীসখানা রেওয়ায়েত করেছেন।
(‘আল্ল­াহ তা’আলাকে কে সৃষ্টি করেছে ?’ এ জাতীয় প্রশ্ন করা শরীয়তে স¤পূর্ণ নিষিদ্ধ। এটা নিষিদ্ধ হওয়ার কারণ হলো এই যে, এরূপ চিন্তায় মগ্ন হলে মানুষ নিজের সীমিত শক্তির দ্বারা  স্রষ্টার সত্ত¡া সম্পর্কে সকল রহস্য উদ্ঘাটন করতে অক্ষম হবে। ফলে সে নাস্তিকতাবাদে দীক্ষিত হয়ে চিরতরে পথভ্রষ্ট হয়। )

৬. তোমাদের প্রভু বলেছেন, যে ব্যাক্তি আমার সৃষ্টির অনুরূপ সৃষ্টি করেছে তার চেয়ে বেশী জালিম আর কে আছে ? শক্তি থাকলে তাদেরকে একটি মশা সৃষ্টি করতে বল, অথবা একটি কণা সৃষ্টি করতে বল। – ইবনুন নাজ্জার আলোচ্য হাদীসখানা হযরত আবু হুরায়রা (রা) থেকে রেওয়ায়েত করেছেন।
(মূর্তি নির্মানকারী, পুতুল পূজারী মুশরিকদেরকে মহান আল্ল­াহ্ এই বলে প্রতিদন্ধিতায় ডেকেছেন যে, তাদের ক্ষমতা থাকলে তারা যেনো একটি মশা অথবা কণা সৃষ্টি করে হাজির করে।)

৭. মহান ও মর্যাদাশীল আল্ল­াহ্ বলেন, যে ব্যক্তি কোন নেককাজ করে তার জন্য এর দশগুণ বা ততোধিক প্রতিদান রয়েছে। আর যে ব্যক্তি কোন খারাপ কাজ করে, এর সমতুল্য অথবা আমি তা ক্ষমা করে দিই। আর যে ব্যক্তি আমার সাথে কোন কিছু অংশীদার স্থির না করে পৃথিবী পরিমান গুনাহ করে তারপর আমার সাথে সাক্ষাত করে, আমি তাকে এর সমপরিমাণ ক্ষমা প্রদান করে থাকি।  আর যে ব্যক্তি আমার দিকে এক বিঘত অগ্রসর হয়, আমি তার দিকে এক হাত অগ্রসর হই। যে ব্যক্তি আমার দিকে এক হাত অগ্রসর হয়, আমি তার দিকে দু’হাত অগ্রসর হই। যে ব্যক্তি আমার দিকে পায়ে হেঁটে অগ্রসর হয়, আমি তার দিকে দ্রুতপদে অগ্রসর হই। – আহমদ, মুসলিম, ইবনে মাজাহ ও আবু আওয়ানা আলোচ্য হাদীসখানা আবু যর (রা) থেকে বর্ণনা করেছেন।

শিরক ও নাস্তিকতা সম্পর্কে হাদীসে কুদসীসমূহ (বাংলা অর্থ)

শিরকে আসগর তথা ছোট শিরক বা রিয়া আমলের প্রতিদান নষ্ট করে দেয়। এর কারণ, আল্ল­াহ তা’আলা কেবলমাত্র তাঁরই উদ্দেশ্যে সম্পাদিত আমল ব্যতীত অন্য কোন আমল কবুল করেন না। যে কাজ আল্ল­াহর সৃষ্টি মানুষের নিকট থেকে শ্রদ্ধা, প্রশংসা বা পদমর্যাদা লাভের উদ্দেশ্যে করা হয়ে থাকে, সে কাজ মহান স্রষ্টা কর্তৃক গৃহীত হয় না। কারণ, লোক দেখানো কাজ  মূলত মানুষকে  আল্ল­াহ তা’আলার সমপর্যায়ে উন্নীত করারই প্রয়াস।
ইবাদতের মূল উদ্দেশ্য মহান আল্ল­াহ তা’আলার তা’যীম করা। রিয়া দ্বারা মানুষকে আল্ল­াহ্র তা’যীমের অংশীদার করা হয়। আর রিয়াকে শিরক বলার তাৎপর্য হলো এই যে, এটা দ্বারা মানুষ উদ্দেশ্যহীনভাবে শিরক তথা অংশীদার স্থির করে থাকে। জেনে রাখা উচিত যে, রিয়া এক জাতীয় লুপ্ত বহুদেববাদ। এ জন্য রাসুলুল্ল­াহ সাল্ল­াল্ল­াহু আলাইহি ওয়া সাল্ল­াম রিয়াকে অন্যান্য শিরকের চেয়ে অধিক ভয় করতেন।

১. শেষ বিচার দিবসে যে ব্যক্তির সর্বপ্রথম বিচার করা হবে সে ব্যক্তি হলো, যে আল্ল­াহর পথে শহীদ হয়েছে। অতঃপর  সে ব্যক্তিকে উপস্থিত করা হবে এবং আল্ল­াহ তাঁর প্রতি তার সকল অনুগ্রহের কথা প্রকাশ করবেন এবং বলবেন “তুমি এসব নিয়ামতের পরিবর্তে কি আমল করেছ ? সে বলবে তোমার উদ্দেশ্যে যুদ্ধ করেছি, এমনকি আমি শাহাদত বরণ করেছি।”  তখন আল্লাহ বলবেন,  তুমি মিথ্যা বলছ, বরং তুমি যুদ্ধ করেছ, যেন তোমাকে সাহসী বীর যোদ্ধা বলা হয়। অতঃপর তোমাকে সাহসী বীর বলা হয়েছে।” তৎপর তাকে জাহান্নামে নিয়ে যাওয়ার হুকুম দেওয়া হবে এবং তাকে উপুড় করে টেনে নিয়ে শেষ পর্যন্ত জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।
তারপর যে ব্যক্তি জ্ঞান লাভ করেছে, তা শিক্ষা দিয়েছে এবং কুরআন তিলাওয়াত করেছে তাকে আনা হবে। তারপর তার প্রতি আল্ল­াহ্ তা’আলা নিজের নিয়ামতসমুহ প্রকাশ করবেন। সেও তা স্বীকার করবে। তখন (আল্ল­াহ্) বলবেন: “ এর বদলে কি আমল করেছ ?” সে বলবে , “জ্ঞান অর্জন করেছি, তা শিক্ষা দিয়েছি এবং তোমার উদ্দেশ্যে কুরআন তিলাওয়াত করেছি।” আল্লাহ তা’আলা বলবেন, “তুমি মিথ্যা বলছ: বরং তুমি বিদ্যা শিখেছ এ উদ্দেশ্যে যেন তোমাকে বিদ্বান বলা হয়। আর কুরআন এ জন্য তিলাওয়াত করেছ যেন তোমাকে ‘ক্বারী’ বলা হয়। অতএব, তোমাকে তাই বলা হয়েছে।”  তারপর তার ব্যাপারে আদেশ দেওয়া হবে এবং তাকে উপুড় করে টেনে নিয়ে শেষ পর্যন্ত জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।
আমদ, নাসায়ী ও মুসলিম আলোচ্য হাদীসখানা আবু হুরায়রা (রা) সূত্রে রেওয়ায়েত করেছেন।
[ আলোচ্য হাদীস দ্বরা প্রমাণিত হয় যে, কপট ও লোক দেখানো আমলের জন্য শহীদ আলিম,ক্বারী প্রভৃতি লোক শেষ বিচারের দিন নিরাশ হবে এবং জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে।

২.নিশ্চয় মহান আল্ল­াহ্ বলেন, আমি তো কোন জ্ঞানী মানুষের কথাই মঞ্জুর করি না; আমি তার উদ্দেশ্য ও কামনাই মঞ্জুর করি। অতঃপর যদি তার অভিলাষ ও কামনা আল্ল­াহ্ যা ভালবাসেন ও পছন্দ করেন সেই উদ্দেশ্যে হয়; তবে তার উদ্দেশ্যকে আমি আমার  প্রশংসা ও মর্যাদায় রূপান্তরিত করি, যদি সে কথা সে না-ও বলে। হামযাহ সাহমী আলোচ্য হাদীসখানা মুহাজির ইবনে হাবীব (রা)-এর সূত্রে রেওয়ায়েত করেছেন।
[আলোচ্য হাদীস দ্বারা এটা প্রতিয়মান হয় যে, আল­াহর নিকট কোন বাগ্মীর বাক পটুতার বিশেষ কোন মূল্য নেই। রিয়া দ্বারা তাকে প্রভাবিত করা যাবে না।

৩. যখন বান্দা প্রকাশ্যে নামাজ আদায় করে এবং তা উত্তমরূপে সম্পন্ন করে, আর সে যখন গোপনে নামাজ আদায় করে তখন আল্লাহ্ বলেন, “এটা হলো আমার খাঁটি বান্দা। ইবনে মাজাহ আলোচ্য হাদীসখানা  হযরত আবু হুরায়রা (রা) সূত্রে রেওয়ায়েত করেছেন।
[যার প্রকাশ্য ও গোপন নামাজে কোন পার্থক্য নেই, সে অহংকার থেকে সম্পুর্ণ মুক্ত। অতএব, সে আল­¬াহ্ তা’আলার খাঁটি বান্দা।

৪. কতিপয় ব্যাক্তিকে শেষ বিচার দিবসে জান্নাতের দিকে যাওয়ার জন্য আদেশ দেওয়া হবে। যখন তার নিকটবর্তী হবে তখন তারা এর সুগন্ধ পাবে এবং জান্নাতের দালানগুলো ও এতে আল্লাহ্ এর অধিবাবাসীদের জন্য যা কিছু তৈরী করেছেন, তার প্রতি তাকাবে। তখন ডেকে বলা হবে,  “এদেরকে  ফিরায়ে আনো- তাতে তাদের কোন অংশ নেই।” তখন তারা নিরাশ হয়ে ফিরে আসবে যেমনটি পূর্ববর্তীগণ কখনও ফিরে আসেনি। তারপর এরা বলবে ঃ “ হে আমাদের প্রতিপালক, যদি তুমি আমাদেরকে তোমার প্রতিদানের জান্নাত এবং উহাতে তোমার বন্ধুদের জন্য যা তৈরী করে রেখেছ তা দেখানোর পূর্বেই জাহান্নামে প্রবেশ করাতে , তবে আমাদের জন্য তা সহজতর হতো।” আল্লাহ্ বলবেন , “হে পাপীগণ,আমি তোমাদের (শাস্তির) জন্য এটাই নির্ধারণ করেছি। যখন তোমরা নির্জনে থাকতে তখন বড় বড় পাপকাজ করে আমার মোকাবেলা করতে আর যখন তোমরা লোকালয়ে আসতে তখন বিনয়ীর ন্যায় তাদের সাথে সাক্ষাত করতে। তোমরা অন্তরে আমাকে যেরূপ বড় মনে করতে, জনগণকে তার বিপরীত দেখাতে। তোমরা মানুষকে ভয় করতে কিন্তু আমাকে ভয় করতে না, মানুষকে বড় মনে করতে কিন্তু আমাকে বড় মনে করতে না। তোমরা মানুষকে দেখানোর উদ্দেশ্যে নিজেকে পবিত্র রাখতে আর আমার জন্য পবিত্র সাজতে। এ কারণে আমি যে আজ তোমাদেরকে জান্নাত থেকে বিরত রেখেছি ( এর উদ্দেশ্য) এর দ্বারা তোমাদেরকে শাস্তির স্বাদ গ্রহণ করাব।” আলোচ্য হাদীসখানা তিবরাণী হযরত আলী ইবনে হাতিম (রা) থেকে রেওয়ায়েত করছেন।
[ আল্ল­াহ্ তা’আলা প্রসঙ্গে কলবে একরূপ ভাব পোষণ করা এবং সমাজে এর বিপরীত দেখানো এটাই হলো রিয়া তথা অহংকার বা ছোট শিরক। এ রিয়া আল্ল­াহর নিকট কিরূপ গৃণ্য এবং রিয়াকারীদেরকে আল্ল­াহ তা’আলা কিভাবে তাদের রিয়ার জন্য সমুচিত শাস্তি দান করবেন, আলোচ্য হাদীসটিতে তারই ইঙ্গিতদেওয়া হয়েছে।

 

 

 

রিয়া বা ছোট শিরক সম্পর্কিত হাদীসে কুদসীসমূহ (বাংলা অর্থ)

তাকদীরে বিশ্বাস স্থাপন করা ঈমানের একটি অপরিহার্য অঙ্গ। তাকদীর শব্দটি আরবি শব্দ। এর অর্থ হলো ভাগ্য নির্ধারণ। পরিভাষায় তাকদীরের অর্থ হলো এই যে, ভবিষ্যতে প্রত্যেক সৃষ্টির জীবনে কি ঘটবে অনাদিকাল থেকে মহান আল্ল­াহ ত্’াআলা তা সুরক্ষিত ফলকে (লাওহে মাহফুজে) লিপিবদ্ধ করছেন। মানুষকে কাজ করার ইচ্ছা, আগ্রহ ও ক্ষমতা আল্ল­াহ দান করেছেন। কখন মানুষ কি কাজ করবে তাও মহান আল্ল­াহর জ্ঞানে রয়েছে। এটা আল্ল­াহর একটি বিধান। কাজ করার ইচ্ছাশক্তি আল্ল­াহ প্রদত্ত হলেও আল্ল­াহ মানুষকে ভাল-মন্দের জ্ঞান দান করেছেন ও যুগে যুগে নবী রাসুল পাঠিয়ে সতর্ক করেছেন।
এটা আশার বাণী যে, আল্ল­াহ তা’আলা মানুষের ভাগ্য নিয়ন্ত্রন করেছেন এবং রদবদল করার অবকাশও রেখেছেন। সুতরাং একনিষ্ঠভাবে আল্ল­াহ তা’আলার দাসত্ব করার মাধ্যমে কল্যাণকামী হওয়ার সূত্রই হলো রহস্যময় তাকদীর।

১. নিশ্চয় আল্ল­াহ তা’আলা সর্বপ্রথম যা সৃষ্টি করেছেন তা হচ্ছে কলম। অতঃপর আল্ল­াহ তাকে বললেন, “লিখ”। সেটা বলল, “হে আমার রব, কি লিখব?” তিনি বললেন “প্রত্যেক বস্তুর আদৃষ্টলিপি, যে পর্যন্ত না-কিয়ামতের সময় এসেছে।  যে ব্যক্তি এর উপর আস্থা না রেখে মৃত্যুবরণ করে, সে আমার সাথে সম্পর্কবিহীন।” হযরত আবু দাউদ (র) আলোচ্য হাদীসটি উবাদাহ ইবনে সামিত (রা)-এর সূত্রে বর্ণনা করেছেন।

২. মহান আল্ল­াহ সৃষ্টিকে সৃষ্টি করলেন এবং প্রত্যেকের বিষয় মীমাংসা করে দিলেন, আর নবীদের নিকট থেকে দৃঢ় অঙ্গীকার আদায় করলেন। তখন আল্লাহর আরশ পানির উপর ছিল। অত:পর যারা ডানদিকের উপযোগী তাদেরকে ডান হাতে এবং যারা বাম হাতের উপযোগী তাদেরকে তাঁর অন্য হাতে নিলেন, আর মহান ও মর্যাদাবান করুণাময়ের উভয় হাতই ডান হাত; তারপর তিনি বললেন, “হে ডানহাতে অবস্থিত ব্যক্তিগণ !” তখন তারা জবাব দিল ও বলল, “আমরা হাযির আছি, হে আমাদের রব এবং আপনার (প্রদত্ত) কল্যাণ কামনা করি।” তিনি বললেন, “আমি কি তোমাদের রব নহি ?” তারা বলল, “হ্যাঁ”। তিনি বললেন, “হে (অন্য হাতে অবস্থিত) ব্যক্তিগণ!” তারা জবাব দিল ও বলল, “আমরা হাযির আছি হে আমাদের রব, আপনার (প্রদত্ত) কল্যাণ হোক।” তিনি বললেন, “আমি কি তোমাদের রব নহি ?” তারা বলল, “হ্যাঁ”। অতঃপর তিনি তাদের একদলকে অন্যের সাথে একত্রে মিলিত করে দিলেন। অতঃপর তাদের মধ্য থেকে জনৈক প্রশ্নকারী বলল, “হে আমাদের রব! আমাদেরকে কেন মিলিয়ে দিলেন?” তখন তিনি বললেন, “”তাদের আমল ছাড়া আরো আমল আছে যা তারা করতেছে। (তাছাড়া)-শেষ বিচার দিবসে যেন তারা বলতে না পারে, আমরা এ বিষয়ে অজ্ঞ ছিলাম। অতপর, তিনি তাদেরকে পুনরায় আদমের পিঠে ফিরিয়ে দিলেন। তারপর বেহেশতবাসীগণ বেহেশতের উপযোগী হলো এবং জাহান্নামের অধিবাসীগণ জাহান্নামের উপযোগী হলো। (তখন) প্রশ্ন করা হলো, “হে আল্ল­াহর রাসূল! তাহলে আমলের অর্থ কি?” তিনি বললেন, “প্রত্যেক সম্প্রদায় স্বীয় অবস্থা অনুসারে আমল করবে।” হযরত আবদ ইবনে হামিদ, হাকেম ও তিরমিযী আবূ উমামাহ (রা)-এর সূত্রে আলোচ্য হাদীস বর্ণনা করেছেন।

৩. নিশ্চয়ই, বরকতময় আল্ল­াহ তা’আলা সর্বপ্রথম লাওহে মাহফুজে যা কিছু লিখেছেন তা, “পরম করুণাময় দয়ালু আল্ল­াহ তা’আলার নামে শুরু করতেছি, নিশ্চয়ই আমি আল্ল­াহ, আমি ছাড়া অন্য কোন উপাস্য নেই। আমার কোন অংশীদার নেই, যে ব্যক্তি আমার মীমাংসার নিকট আত্মসমর্পণ করেছে, আমার কঠিন পরীক্ষায় ধৈর্যধারণ করেছে এবং আমার শাসনে সন্তুষ্টি রয়েছে, আমি তাকে সত্যবাদীরূপে লিখেছি; এবং তাকে কিয়ামতের দিন সত্যবাদীদের সঙ্গে পুনর্জীবিত করব।” ইবনুল নাজ্জার আলোচ্য হাদীসখানা হযরত আলী (রা)-এর সূত্রে রেওয়ায়েত করেছেন।

৪. মহান ও মর্যাদাবান আল্ল­াহ তা’আলা বলেন, “যে যুবক আমার নির্ধারিত তকদীরে বিশ্বাসী আর আমার নির্ধারিত লেখনীতে সন্তুষ্ট, আমার দেওয়া জীবনোপকরণে তৃপ্ত এবং আমার খাতিরে প্রব্রত্তির কামনা পরিত্যাগী, যে আমার নিকট কোনো কোনো ফেরেশতার মত।” দায়লামী আলোচ্য হাদীস খানা হযরত ইবনে উমর (রা)-এর সূত্রে উলে­খ করেছেন।
[আলোচ্য হাদীসে তাকদীরে বিশ্বাসের পাশাপাশি উত্তম আমলকে যেভাবে একত্রে গ্রথিত করা হয়েছে, তাতে স্পষ্ট প্রমাণিত হয় যে, তাকদীরের নিয়ন্ত্রণে আমলের অনেক প্রভাব রয়েছে। উপরন্তু কাজ করা হবে অথচ তার ফল আসবে না, এটা অস্বাভাবিক।]

৫. হযরত জিরাঈল (আ) আমার নিকট আগমন করলেন, এবং বললেন “হে মুহাম্মদ! নিশ্চয়ই আপনার প্রভু আপনাকে সালাম জানিয়ে বলেছেন, নিশ্চয়ই আমার বান্দাদের মধ্যে এরূপ বান্দাও রয়েছে, ঐশ্বর্য ছাড়া যার ঈমান ঠিক থাকে না। যদি তাকে গরীব করে নেই, তবে সে কাফির হয়ে যাবে। আর নিশ্চয়ই আমার বান্দাদের মধ্যে এরূপ ব্যক্তি রয়েছে, দারিদ্র্য ছাড়া যার ঈমান ঠিক থাকে না। যদি আমি তাকে ধনী করে দেই, তবে নিশ্চয়ই সে কাফির হয়ে যাবে। আর আমার বান্দাদের মধ্যে নিশ্চয়ই এরূপ ব্যক্তি আছে, রোগাগ্রস্ত ছাড়া যার ঈমান ঠিক থাকে না। তাকে যদি সুস্থতা দান করি তবে নিশ্চয়ই সে কাফির হয়ে যাবে। আর নিশ্চয়ই আমার বান্দাদের মধ্যে এরূপ ব্যক্তি আছে, স্বাস্থ্য ছাড়া যার ঈমান ঠিক থাকে না। যদি তাকে রোগাগ্রস্ত করে দেই, তবে নিশ্চয় যে কাফির হবে।” খাতীব আলোচ্য হাদীসখানা হযরত উমর (রা)-এর সূত্রে উলে­খ করেছেন।
[দুনিয়ায় আল্ল­াহ তা’আলা বিভিন্ন মানুষকে বিভিন্নরূপ কল্যাণের অধিকারী করে রাখার প্রকৃত কারণ কি, আলোচ্য হাদীস সে রহস্যের ওপর আলোকপাত করতেছে।]

৬. কোন একস্থানে একটি পাথর পাওয়া গিয়েছিল, তাতে লেখা ছিল, “আমি আল্লাহ, বাক্কার (মক্কার) মালিক, আমি ভাল ও খারাপ পয়দা করেছি। অতঃপর কল্যাণ তার জন্য, যার হাত দিয়ে ভাল সৃষ্টি করেছি। আর ধ্বংস সে ব্যক্তির জন্য, যার হাত দিয়ে খারাপ পয়দা করেছি।” দায়ালামী আলোচ্য হাদীসখানা হযরত আনার (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন।

৭. মহান আল্ল­াহ তা’আলা ইরশাদ করেছেন, “যে ব্যক্তি আমার নির্ধারিত ভাগ্যে সন্তুষ্ট নয়, আর আমার অগ্নি পরীক্ষায় ধৈর্যধারণ করতে পারে না তার উচিত সে যেন আমাকে ব্যতীত অন্য প্রভু অনুসন্ধান করে নেয়।”
তিবরানী আলোচ্য হাদীসখানা সাঈদ ইবনে যিয়াদ (রাঃ)-এর সূত্রে উলে­খ করেছেন।
[আলোচ্য হাদীসে যারা ভাগ্যলিপিতে বিশ্বাস করে না, তাদের ব্যাপারে আল্ল­াহ তা’আলা কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন।]
৭. হযরত জিবরাঈল (তাঃ) আমাকে বললেন, মহান ও মর্যাদাবান আল্ল­াহ বলেছেন, “হে মুহাম্মদ! যে ব্যক্তি আমার ওপর ঈমান এনেছে, অথচ আমার দ্বরা ভাল-মন্দ নিয়ন্ত্রণে (তাকদীরে) বিশ্বাস করে না, সে যেন আমাকে ছাড়া অন্য একজন প্রতিপালক খোঁজ করে নেয়।” সিরাজী আলোচ্য হাদীস খানা হযরত আলী (রাঃ) থেকে উলে­খ করেছেন।

তাকদীর (ভাগ্য পর্ব) সম্পর্কে হাদীসে কুদসীসমূহ (বাংলা অর্থ)

মহান আল্ল­াহ রাব্বুল আলামীন মানব জাতিকে অত্যন্ত সুন্দর আকৃতিতে পয়দা করেছেন। দিয়েছেন সকল স্রষ্টির ওপর শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা। মানুষের প্রতি তাঁর অনুগ্রহ ও অনুকম্পার সীমা নেই। তিনি তাঁর বান্দাদের প্রতি অত্যন্ত স্নেহশীল, করুণাময়, দয়াময়। তিনি বান্দার কল্যাণে সদা নিয়োজিত। বান্দা ভুল-ত্র“টি, অপরাধে লিপ্ত হওয়ার পরও যখনই তওবা করে, ক্ষমা চায়, আল­াহ তাঁর বান্দার তওবা কবুল করেন। ক্ষমা করেন তাঁর পাপী বান্দাদের আপন মহিমায়। আল্ল­াহ তা’আলার যেসব গুণবাচক নাম রয়েছে; তার প্রায় সবগুলিই তাঁর দয়া-মায়া, ক্ষমা, করুণা, স্নেহ ইত্যাদি সপর্কিত। সুতরাং তাঁর প্রতি সুধারণা রাখা ঈমানের অপরিহার্য দাবী। তিনি মানুষকে শাস্তি দিলেও মানুষের কল্যাণের জন্যই দেন। তিনি সর্বাধিক ন্যায়বিচারক, আহকামুল হাকিমীন। তিনি মানুষের প্রতি যে আচরণ করেন, সবই ন্যায়সঙ্গত। তাঁর প্রতি আমাদের মনোভাব নমনীয় হতে হবে। তাঁর যাবতীয় হুকুম আহকাম ও বাণীকে সঙ্গত মনে করতে হবে। তাঁর ইচ্ছার কাছে আত্মসমর্পণ করতে হবে। অন্যথায় ঈমানদার হওয়া কোনক্রমেই সম্ভব নয়।

১. হাদীসে কুদসীতে মহান ও মর্যাদাবান আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেছেন, “আমি আমার প্রতি আমার বান্দার ধারণার সাথে আছি। যদি সে আমার প্রতি ভাল ধারণা পোষণ করে তা তারই সঙ্গে থাকব।” ইমাম আহমদ আলোচ্য হাদীসখানা হযরত আবূ হুরায়রা (রাঃ)-এর সূত্রে উলে¬খ করেছেন।

২.  মহান আল্লাহ তা’আলা বলেছেন, “আমার ব্যাপারে বান্দাদের ধারণার পাশাপাশি আমি আছি। যদি কেউ ভাল ধারণা পোষণ করে, তবে তা তার জন্য ভাল। আর যদি সে মন্দ ধারণা পোষণ করে, তবে তা তার মন্দ।” তিবরারী আলোচ্য হাদীসখাান ওয়াসিল (রা)-এর সূত্রে রেওয়ায়েত করেছেন।

৩.  মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন, “হে আমার বান্দা! আমি আমার প্রতি তোমার ধারণার সাথে আছি। তুমি যখন আমাকে আহবান কর, তখন আমি তোমার সাথে অবস্থান করি।” হাকেম আলোচ্য হাদীসখানা হযরত আনাস (রাঃ)-এর সূত্রে উলে¬খ করেছেন।

৪. হাদীসে কুদসীতে মহান ও মর্যাদাবান আল্লাহ তা’আলা বলেন, “আমি আমার প্রতি আমার বান্দার ধারণার সাথে আছি। আর যখন সে আমাকে স্মরণ করে তখন আমি তারই সাথে থাকি। সে যদি আমাকে মনে মনে স্মরণ করে, আমিও তাকে মনে মনে স্মরণ করি। সে যদি আমাকে কোন এক সম্প্রদায়ের মধ্যে স্মরণ করে, আমি তাকে তার চেয়ে অধিকতর উত্তম সম্প্রদায়ের মধ্যে স্মরণ করি। সে যদি আমার দিকে এক বিঘত পরিমাণ অগ্রসর হয়,  আমি  তার  দিকে  একহাত  পরিমাণ  অগ্রসর হই। সে যদি আমার দিকে এক হাত নিকটবর্তী হয়, তবে আমি তার দিকে দুই হাত নিকটবর্তী হই। আর সে যদি আমার দিকে হেঁটে অগ্রসর হয়, তবে আমি তার দিকে দৌড়িয়ে অগসর হই।  ” ইমাম আহমদ ও শায়খাইন আলোচ্য হাদীসখানা হযরত আবু হুরায়রা (রা)-এর সূত্রে উলে­খ করেছেন।
( অধিকতর উত্তম সম্প্রদায় অর্থ আল্লাহ তা’আলার প্রিয় ফেরেশতামন্ডলী। আলোচ্য হাদীস থেকে এটা প্রমাণিত হয় যে, বান্দা আল্লাহর সাথে যোগাযোগ রক্ষা করতে যেরূপ উদ্যোগী, মহান আল্লাহও তার সাথে যোগাযোগ রক্ষা করার জন্য ততোধিক উদ্যোগী )

৫. মহান ও মর্যাদাবান আল্লাহ তা’আলা বলেন, “হে বনী আদম! তুমি আমার নিকট আসার জন্য দডায়মান হও, যেন আমি তোমার নিকট আসার জন্য হাঁটতে আরম্ভ করি। আর তুমি আমার কাছে আসার জন্য হাঁট, যেন আমি তোমার নিকট দ্রুত আসতে পারি। হে বনী আদম! যদি তুমি আমার একবিঘত নিকটবর্তী হও, তবে আমি তোমার একহাত নিকটবর্তী হই, আর তুমি যদি আমার দিকে একহাত পরিমাণ অগ্রসর হও, আমি তোমার দিকে একগজ অগ্রসর হই। হে বনী আদম! তুমি যখন মনে মনে কোন ভাল কাজ করার কথা বল, কিন্তু তখনও তুমি তা কর নাই, আমি তোমার স্বপক্ষে একটি সওয়াব লিখি। আর যখন তুমি কোন পাপ করার ইচ্ছা পোষণ কর, তারপর আমার ভয় তোমকে তা থেকে বিরত রাখে, তখন আমি তার পরিবর্তে তোমার জন্য একটি সওয়াব লিখি। আর যখন তুমি তা কাজে পরিণত কর, আমি তার পরিবর্তে তোমার জন্য একটি গুনাহ লিখি।” হাকেম আলোচ্য হাদীসখানা হযরত আবূযর (রা)-এর সূত্রে উলে­খ করেছেন।

৬. মহান ও পরাক্রমশালী আল্লাহ তা’আলা বলেন, “আমি আমার বান্দার কোন অধিকার রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব গ্রহণ করি না- যে পর্যন্ত বান্দা আমার অধিকার রক্ষায় তৎপর না হয়।” তিবরানী আলোচ্য হাদীসখানা হযরত আবদুল­াহ ইবনে আব্বাস (রা)-এর সূত্রে উলে­খ করেছেন।

৭. মহাপরাক্রমশালী আল্ল­াহ তা’আলা বলেছেন, “আমার বান্দা যখন আমার সাক্ষাত ভালবাসে, আমিও তার সাক্ষাত ভালবাসি। আর যখন সে আমার সাক্ষাত ঘৃণা করে, আমিও তার সাক্ষাত ঘৃণা করি।” ইমাম মালিক ও বুখারী আলোচ্য হাদীসখানা হযরত আবু হুরায়রা (রা)-এর সুত্রে রেওয়ায়েত করেছেন।
(যার প্রসঙ্গে উত্তম অভিমত পোষণ করা হয় তার সাক্ষাত মানুষ লাভ করতে চায়। অতএব যে আল্ল­াহ প্রসঙ্গে ভাল ধারণা পোষণ করে, সে ব্যক্তি আল্ল­াহর সাক্ষাত লাভ করতে চাবে )

৮. তোমরা যদি চাও তবে আমি তোমাদেরকে বলতে পারি শেষ বিচারের দিন আল্ল­াহ তা’আলা মু’মিনদের সঙ্গে সর্বপ্রথম কি কথা বলবেন এবং মু’মিনগণ সর্বপ্রথম কি বলবে? অতঃপর ­আল্লাহ তা’আলা নিশ্চয়ই মু’মিনদেরকে জিজ্ঞাসা করবেন, “তোমরা কি আমার সাক্ষাত লাভ করার আশা করতেছ?” তারা জবাব দিবে, “হ্যাঁ, হে আমার প্রতিপালক!” আল্ল­াহ জিজ্ঞাসা করবেন, “কি জন্য?” তারা বলবে, “আমরা আপনার ক্ষমা ও মাগফিরাত আশা করতেছিলাম।” তখন আল্ল­াহ বললেন, “তোমাদের ক্ষমা করে দেওয়া আমার ওপর আবশ্যক করলাম।”। আবদুল­াহ ইবনুল মুবারক আলোচ্য হাদীসখানা হযরত মুয়ায (রা)-এর সূত্রে বর্ণনা করেছেন।
( মহান আল্ল­াহর প্রতি ভাল ধারণা ও ক্ষমার আশা পোষণকারীদের প্রতি আল­াহ কিরূপ করুণাময় ও ক্ষমাশীল, আলোচ্য হাদীসে তা স্পষ্ট করে তুলে ধরা হয়েছে। তাঁর কাছে যারা ক্ষমার আশা করে, তাদেরকে মার্জনা করা আল্ল­াহ নিজের ওপর আবশ্যক করে নিয়েছেন।)

৯. হাদীসে কুদসীতে উলল্ল­খ আছে, কোন এক ব্যক্তি তার নিজের ওপর অমিতাচার করেছিল। অতঃপর যখন তার নিকট মৃত্যু উপস্থিত হলো, সে তার  সন্তানদেরকে উপদেশ দিয়ে বলল, “আমি যখন মৃত্যুবরণ করব তখন আমাকে তোমরা (আগুনে ) জ্বালিয়ে ফেলবে। অতঃপর আমাকে মিহি গুঁড়ায় পরিণত করবে। তারপর আমাকে সমুদ্রে ফেলে দিবে। আল্ল­াহর শপথ। যদি আমার প্রতিপালক, আমাকে কাবুতে পান (ধরতে পারেন), তবে তিনি নিশ্চয়ই আমাকে এরূপ শাস্তি দিবেন, যা তিনি অন্য কাউকে দেননি।” অতএব সন্তানেরা পিতার উপদেশ অনুযায়ী কাজ করল। তারপর আল্ল­াহ যমীনকে আদেশ করলেন, “তুমি যা গ্রহণ করেছ তা ফেরত দাও।” তৎক্ষনাৎ সে ব্যক্তি আল্ল­াহর সামনে এসে দাঁড়াল। আল্ল­াহ তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, “তুমি যা করেছ, তা কিসের তাড়নায় করলে?” জবাবে সে বলল, “তোমার ভয়ে, হে আমার প্রভ!ু” আল্ল­াহ এতে তাকে ক্ষমা করলেন। ইমাম আহমদ ও বুখারী আলোচ্য হাদীসখানা হযরত আবূ হুরায়রা (রা)-এর সূত্রে উলে­খ করেছেন।

১০. শেষ বিচারের দিন যখন আসবে এবং আল্ল­াহ সমূদয় সৃষ্টির মীমাংসা শেষ করবেন, তখন শুধু দু’ব্যক্তি বাকী থাকবে। এ দু’জনকে দোযখে নিক্ষেপ করার আদেশ দেওয়া হবে। তাদের একজন বারবার পেছনে ফিরে তাকাবে। তখন মহা পরাক্রমশালী আল্ল­াহ তা’আলা বলবেন, “তাকে ফিরিয়ে আন।” তারা (ফেরেশতাগণ) তাকে ফেরৎ আনবে। তখন আল্লাহ তাকে জিজ্ঞাসা করবেন, “কেন তুমি বারবার পেছনে ফিরে তাকাচ্ছিলে?” জবাবে সে বলবে, “আমি আশা করতেছিলাম, আপনি আমাকে বেহেস্তে প্রবেশ করাবেন।” অতএব তাকে বেহেস্তে প্রবেশ করাবার আদেশ দেওয়া হবে। তখন সে বলবে, “মহান প্রতাপশালী আল্ল­াহ আমাকে এত ঐশ্বর্য দান করেছেন যে, আমি যদি সকল অধিবাসীকে  দাওয়াত  করে খাওয়াই তবুও আমার নিকট যে সম্পদ আছে তাতে কোন কমতি হবে না।” ইমাম আহমদ ইবনে সামিত (রা)-এর সূত্রে আলোচ্য হাদীসখানা বর্ণনা করেছেন।
( মহান আল্ল­াহর ক্ষমার আশায়ই সে পেছনে ফিরে তাকাবে এবং এতটুকু ভাল ধারণার দরুন আল্ল­াহ তাকে ক্ষমা করে দিবেন। এ ব্যক্তিও পাপী ঈমানদার। ঈমান ছাড়া কোন অবস্থাতেই নাজাত পাওয়া যাবে না।)

১১. মহান ও পরাক্রমশালী আল্লহ তা’আলা  এক বান্দাকে দোযখে প্রবেশ করাবার আদেশ দেবেন। যখন সে তার কিনারায় পৌঁছবে, তখন পেছনে ফিরে তাকাবে এবং আবেদন করবে, “আল্ল­াহর শপথ, হে প্রভু! তোমার প্রসঙ্গে কি আমার সুধারণা ছিল না?” তখন মহান মর্যাদাবান  আল্ল­াহ বলবেন,  “তাকে ফিরিয়ে আন। কারণ, আমি আমার বান্দার ধারণার সাথে থাকি।” আল্ল­াহ তা’আলা তাকে ক্ষমা করবেন। ইমাম বায়হাকী হযরত আবু হুরায়রা (রা) সূত্রে আলোচ্য হাদীসখানা নকল করেছেন।

১২. হাদীসে কুদসীতে আল্ল­াহ তা’আলা বলেছেন, “আমার নৈকট্য লাভকারীগণ ধর্ম নিষ্ঠার মত অন্য কিছুর সাহায্যে আমার নৈকট্য লাভ করতে পারে না।” আবুশ শায়খ আলোচ্য হাদীসখানা বর্ণনা করেছেন।

১৩. মহান আল্ল­াহ তা’আলা বলেন, “আমার প্রসঙ্গে বান্দার যে ধারণা রয়েছে, আমি তার সঙ্গেই অবস্থান করি। সে আমাকে যখন স্মরণ করে তখন আমি তর সাথেই অবস্থান করি।” রসুলুল্ল­াহ সাল্লল্লা­াহু আলাইহি ওয়া সাল্ল­াম বলেন, “আল্ল­াহর কসম, তোমাদের তওবাতে আল্ল­াহ তা’আলা তদ্রুপ আনন্দিত হন, তোমরা মরুভূমিতে হারানো তোমাদের কোন প্রাণী ফিরে পেলে যেরূপ আনন্দিত হও। (মহান আল্লাহ বলেন)  যে ব্যক্তি আমার দিকে এক বিঘত অগ্রসর হয়, আমি তার দিকে একহাত অগ্রসর হই। যে ব্যক্তি আমার দিকে একহাত অগ্রসর হয়, আমি তার দিকে একগজ(দুইহাত) অগ্রসর হই; আর যখন সে আমার দিকে পায়ে হেঁটে অগ্রসর হয়, তখন আমি দ্রুতগতিতে তার দিকে অগ্রসর হই.। ইমাম মুসলিম আলোচ্য হাদীসখানা হযরত আবূ হুরায়রা (রা) থেকে নকল করেছেন।

মহান আল্ল­াহর সম্পর্কে সুধারণা পোষণ সম্পর্কিত হাদীসে কুদসীসমূহ (বাংলা অর্থ)

মহান আল্ল­াহর সাথে সরাসরি সংযোগ স্থাপনের শ্রেষ্ঠতম পন্থা হলো তার যিকির। আল্ল­াহ তা’আলা ইরশাদ করেছেন, “তোমরা আমাকে স্মরণ কর, তাহলে আমি তোমাদেরকে স্মরণ করব।”(সূরা বাকারাঃ ১৫২)। যারা দাঁড়িয়ে বসে অথবা শায়িত অবস্থায় আল্ল­াহকে স্মরণ করে তারা জ্ঞানী; আল্ল­াহর যিকিরের মাধ্যমে মনে শান্তি আসে। বস্তুত জীবনের সকল অবস্থায়ই মহান আল্ল­হকে স্মরণ করা একান্ত কর্তব্য।
মহান আল্ল­াহ তা’আলা অন্তর্যামী। তাঁর কোন বান্দা কিরূপে ও কতখানি তাঁকে স্মরণ করে তা তিনি জানেন। সে অনুযায়ী তিনিও তাকে স্মরণ করেন। আল্ল­াহ যাকে স্মরণ করেন সে সে দুনিয়া ও আখিরাতে সর্বাপেক্ষা সৌভাগ্যশালী ও সফলকাম তাতে কোন সন্দেহ নেই।  আল্ল­াহকে স্মরণ না করলে আল্ল­াহর সাথে সম্পর্ক শিথিল হয়ে যায়। এজন্য রসুলুল্ল­াহ সাল্ল­াল্ল­াহু আলাইহি ওয়াসাল্ল­াম যিকিরের আদেশ করেছেন।

১. মহান পরাক্রমশালী আল্ল­াহ তা’আলা বলেছেন, “তোমরা আমাকে আনুগত্যের সাথে স্মরণ কর, আমি তোমাদেরকে ক্ষমা সহকারে স্মরণ করব। যে ব্যক্তি আমাকে স্মরণ করার পাশাপাশি আমার আদেশ পালনকারী হয়, তবে আমার ওপর আবশ্যক হয়ে পড়ে, আমি যেন তাকে ক্ষমা সহকারে স্মরণ করি। আর যে ব্যক্তি আমাকে স্মরণ করে- অথচ সে আমার অবাধ্য, আমার ওপর আবশ্যক হয়ে পড়ে, যেন আমি তাকে ঘৃণার সাথে স্মরণ করি।” দায়লামী আলোচ্য হাদীসখানা আবী হিন্দ দওয়ারী (রা) সূত্রে বর্ণনা করেছেন।

২. মহান আল্ল­াহ তা’আলা বলেছেন, “হে বনী আদম! ফজর ও আসরেরর নামাযের পর কিছু সময়ের জন্য আমাকে স্মরণ করিও। তাহলে উভয় নামাযের মধ্যবর্তী সময়ে আমি তোমার সহায়তা করব।” আবূ নুয়াইম হযরত আবু হুরায়রা (রা)-এর সূত্রে আলোচ্য হাদীসখানা বর্ণনা করেছেন।

৩. নিশ্চয়ই মহান আল্ল­াহ তা’আলা বলেন, “আমি আমার বান্দার সাথে অবস্থান করি। যতক্ষণ সে আমাকে স্মরণ করে এবং আমার যিকিরের মধ্যে তার উভয় ঠোঁট নড়াচড়া করে।” ইমাম আহমদ আলোচ্য হাদীসখানা হযরত আবূ হুরায়রা (রা)-এর সূত্রে রেওয়ায়েত করেছেন। (উক্ত মর্মের হাদীস হযরত আবুদ দারদা (রা) থেকেও বর্ণিত হয়েছে।)

৪. মহান আল্ল­াহ তা’আলা বলেছেন, “আমার যিকির যাকে এভাবে লিপ্ত রাখে যে, সে আমার নিকট তার কাম্যবস্তু চাওয়ারও সুযোগ পায়না, আমি তার প্রয়োজন চাওয়ার পূর্বেই তাকে দিয়ে থাকি।” আবু নুয়াইম আলোচ্য হাদীসখানা হুযাইফা (রা)-এর সুত্রে বর্ণনা করেছেন।

৫. মহান আল্ল­াহ তা’আলা বলেছেন, “আমার বান্দা যখন আমাকে নির্জনে স্মরণ করে, আমিও তাকে নির্জনে স্মরণ করি। আর যখন সে আমাকে কোন জামাতের মধ্যে স্মরণ করে, আমিও তাকে এমন এক জামাতের মধ্যে স্মরণ করি, যা তার সে জামাতের চেয়ে উত্তম যার মধ্যে সে আমাকে স্মরণ করেছিল।” তিবরানী আলোচ্য হাদীসখানা হযরত আবদুল­াহ ইবনে আব্বাস (রা)-এর সূত্রে উল্লে­খ করেছেন।

৬. মহান আল্ল­াহ তা’আলা  বলেছেন, “হে বনী আদম! যতক্ষণ তুমি আমার যিকির কর ততক্ষণ তুমি আমার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর। আর যতক্ষণ তুমি আমাকে ভুলে থাক ততক্ষণ তুমি আমার প্রতি অকৃতজ্ঞ থাক।”  আলোচ্য হাদীসখানা হযরত আবূ হুরায়রা (রা)-এর সূত্রে বর্ণনা হইয়াছে।

৭. মহান ও মর্যাদাবান আল্ল­াহ তা’আলা বলেছেন, “যে ব্যক্তি রাগান্বিত হওয়ার মুহূর্তে আমাকে স্মরণ করে, আমিও তাকে রাগান্বিত হওয়ার সময় স্মরণ করব এবং যাদেরকে আমি ধ্বংস করব, তাকে তাদের পর্যায়ভূক্ত করব না।” দায়লামী আলোচ্য হাদীসখানা হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণনা করেছেন।

৮. মহান আল্ল­াহ তা’আলা বলেন, “আমার যিকির যাকে এরূপভাবে লিপ্ত রাখে যে, সে আমার নিকট কিছু চাওয়ার সুযোগ পায় না, তাকে আমি এমন বস্তু দান করব, যা যাঞ্ছাকারীদের প্রাপ্য বস্তু থেকেও উত্তম।” ইমাম বুখারী আলোচ্য হাদীসখানা হযরত জাবির (রা) থেকে বর্ণনা করেছেন।

৯. হযরত মূসা (আ) বললেন, “হে আমার প্রতিপালক! আপনি কি আমার বেশি নিকটবর্তী যে, আমি আপনাকে অনুচ্চস্বরে আহবান করব, নাকি আমা থেকে দূরে যে উচ্চস্বরে আহবান করব? কারণ আমি তো আপনার সুরের মাধুরী অবশ্যই অনুভব করি। কিন্তু আমি আপনাকে দেখতে পাই না। তাহলে আপনি কোথায় অবস্থান করেন?” মহান আল্ল­াহ বললেন, “আমি তোমার পেছনে, তোমার সামনে, তোমার ডানে এবং তোমার বামে অবস্থান করি। হে মুসা! আমি আমার বান্দার সাথে বসে থাকি যখন সে আমার যিকির করে। আমি তার পাশে থাকি যখন সে আমাকে আহবান করে।” দায়লামী আলোচ্য হাদীসখানা হযরত সাওবান (রা) থেকে রেওয়ায়েত করিয়াছেন।

১০. হযরত মূসা (আ) বললেন, “হে আমার প্রতিপালক! আমি চাই যে, তুমি তোমার বান্দাদের মধ্যে যাকে ভালবাস আমিও যেন তাকে ভালবাসতে পারি।” আল্ল­াহ তা’আলা বললেন, “(হে মুসা), যখন তুমি দেখ যে, আমার কোন বান্দা আমার বেশি যিকির করতেছে (তখন বুঝিও) আমি তাকে এর তাওফিক দান করেছি এবং আমার অনুমতিক্রমেই সে আমার যিকির করতেছে এবং আমি তাকে ভালবাসি। আর যখন দেখ যে, আমার কোন বান্দা আমার যিকির করে না, তখন মনে করিও আমি তাকে এটা (আল্লহর যিকির) থেকে বিরত রেখেছি এবং আমি তার ওপর রুষ্ট।” দারু কুতনী আলোচ্য হাদীসখানা হযরত উমর (রা) থেকে বর্ণনা করেছেন।

১১.নিশ্চচয়ই যমীনে বিচরণকারী আল্ল­াহ তা’আলার একদল ফেরেশতা আছে, যারা মানুষের আমলনামা লিখে রাখে এবং তারা পথে পথে আল্ল­াহর যিকিরকারীদেরকেও খোঁজ করে। অতঃপর যখন তারা কোন সম্প্রদায়কে আল্ল­াহর যিকিরে নিয়োজিত পায়, তখন উচ্চস্বরে একে অন্যকে ডেকে বলে,- “আস, তোমরা যা খোঁজ করতেছ তা এখানে আছে।” তারপর তারা তাদের পাখা দ্বারা তাদেরকে নিকটতম আকাশ থেকে পৃথিবী পর্যন্ত বেষ্টন করে নেয়। তখন তাদের প্রতিপালক তাদেরকে জিজ্ঞাসা করেন,- অথচ তিনি তাদের চেয়ে বেশি জানেন, “আমার বান্দাগণ কি বলে?” তখন তারা বলে, “(হে প্রভু!) তারা তোমার পবিত্রতা, তোমার মহত্ত¡, তোমার প্রশংসা ও তোমার মর্যাদা বর্ণনা করেছে।” তখন আল্ল­াহ বলেন, “তারা কি আমাকে দেখতেছে?” তারা আরয করেন, “না, আল্ল­াহর কসম, তারা তোমাকে দেখে নাই। ”আল্ল­াহ বলেন, “যদি তারা আমাকে দেখত, তবে কি অবস্থা হত?” ফেরেশতারা বলেন, “যদি তারা তোমাকে দেখত, তবে তোমার উপাসনা, তোমার মর্যাদা বর্ণনা ও তোমার পবিত্রতার ঘোষণা আরও বেশি করত।” তখন আল্ল­াহ বলেন, “তারা আমার নিকট কি চায়?” ফেরেশতাগণ আবেদন করেন, “তারা তোমার নিকটি বেহেশত কামনা করে।” তখন আল্ল­াহ বলেন, “তারা কি তা দেখতেছে?” ফেরেশতাগণ আরয করেন, ‘না’, আল্লাহর কসম, হে প্রতিপালক! তারা তা দেখেনি। তখন আল্ল­াহ তা’আলা বলেন, “যদি তারা তা দেখত তবে কিরূপ হত?” তখন তারা বলেন, “যদি তারা তা দেখত তবে তারা জান্নাতকে আরো কামনা করত, তার অধিক খোঁজ করত এবং তাতে আরো বেশি আগ্রহান্বিত হত।” মহান আল্ল­াহ বলেন, “এই বান্দাগণ কি বস্তু থেকে আশ্রয় চাচ্ছে?” তারা বলেন, “জাহান্নাম থেকে।” মহান ও মর্যাদাবান আল্লাহ তখন বলেন, “তারা কি তা দেখতেছে?” তারা বলেন, “না, আল্লাহর শপথ, হে প্রভু! তারা তা দেখে নাই।” আল্ল­াহ তা’আলা বলেন, “তাদের কিরূপ অবস্থা হত যদি তারা তা দেখত?” তখন তারা আরয করে, “যদি তারা তা দেখত তবে তা থেকে আরো অধিক দুরে পলায়ন করত এবং তাকে আরও বেশি ভয় করত।” তখন আল্ল­াহ বলেন, “আমি তোমাদেরকে স্বাক্ষী রাখতেছি, আমি তাদেরকে ক্ষমা করে দিলাম।” তখন ফেরেশতাদের মধ্যে থেকে এক ফেরেশতা বলে, “তাদের মধো অমুক ব্যক্তি আছে, যে তাদের (যিকিরকারীদের) অন্তর্ভূক্ত নয়। সে কোন প্রয়োজনে তাদের নিকট এসেছিল।”  তখন আল্ল­াহ বলেন, “তারা এরূপ এক সম্প্রদায় যে, তাদের সঙ্গে উপবেশনকারীও হতভাগ্য হয় না।” আহমদ ও শায়খাইন হযরত আবু হুরায়রা (রা) থেকে আলোচ্য হাদীসখানা উল্ল­খ করেছেন।

১২. মহান আল্ল­াহ হযরত দাউদ (আ)-এর প্রতি ওহী অবতীর্ণ করে বললেন, অন্যাচারীদেরকে বলে দাও, তারা যেন আমার যিকির না করে। কারণ যে ব্যক্তি আমার যিকির করে, আমিও তার যিকির করি। আর অত্যাচারীদেরকে স্মরণ করার অর্থ হলো তাদের ওপর আমার লা’নত বর্ষণ করা।” হাকেম আলোচ্য হাদীসখানা হযরত আবদুল্ল­াহ ইবনে আব্বাস (রা)-এর সূত্রে বর্ণনা করেছেন।

 

 

 

মহান আল্ল­াহর যিকির সম্পর্কিত হাদীসে কুদসীসমূহ (বাংলা অর্থ)

আল্ল­াহ রাব্বুল আ’লামীন করুণাময় ও ক্ষমার আঁধার। মানুষের সাথে তার সম্পর্কের মূলে রয়েছে তাঁর ক্ষমা ও করুণা। বান্দার প্রতি ক্রোধ ও তার ওপর প্রতিশোধ গ্রহণ মহান আল্লহর স্বভাব নয়, সৃষ্টির সফলতা ও কল্যাণের জন্য শাসন মাত্র। মহান ­আল্লাহর প্রিয় ও সৃষ্টির সেরা মানুষ যত জঘন্যতম অপরাধই করুক না কেন,  তিন তা করুণাবশে ক্ষমা করে দেন। বস্তুত মহান আল্ল­াহ করুণা ও ক্ষমার আঁধার। বান্দা যখন আল্ল­াহ তা’আলার দয়া কামনা করে এবং তাঁর নিকট ক্ষমা চায়, তখন মহান আল্ল­াহ তাকে নিরাশ করেন না। বরং তিনি তাকে এরূপে ক্ষমা করে দেন যা সে কল্পনাও করতে পারে না। বান্দার পক্ষ থেকে আল্ল­াহর নিকট করুণা ও ক্ষমা প্রার্থনা আল্ল­াহর ইচ্ছা। কারণ তিনি দয়া ও ক্ষমা করার জন্য উন্মুখ রয়েছেন। আল্ল­াহর নিকট করুণা প্রার্থনা করাই বান্দার কাজ। যদি কেউ মনে করে যে, সে কেবল নিজ আমল দ্বারাই আল্ল­াহকে খুশী করতে পারবে, আল্ল­াহর দয়ার কোন দরকার নেই, সে পরিণামে নিরাশ হবে।

১.নিশ্চয়ই আল্ল­াহ তা’আলা যখন সৃষ্টিকে প্রকাশ করলেন, তখন তিনি স্বহস্তে তার নিজেন জন্য অবশ্য কর্তব্য বলে লিখলেন- “নিশ্চয়ই আমার করুণা আমার রাগের ওপর প্রভাব বিস্তার করবে।” ইবনে মাজাহ আলোচ্য হাদীসখানা হযরত আবু হুরায়রা (রা)-এর সূত্রে বর্ণনা করেছেন।  হযরত আবু হুরায়রা (রা) থেকে অনুরূপ হাদীস ইমাম তিরমিযী এবং দারে কুতনীও বর্ণনা করেছেন।

২. হাদীসে কুদসীতে মহান আল্ল­াহ তা’আলা ইরশাদ করেন, “যখন আমার বান্দা কোন একটি নেক আমল করার ইচ্ছা করে, কিন্তু তখনও তা করেনি, আমি তার জন্য একটি সওয়াব লিখি। আর যদি সে তা সম্পাদন করে তবে আমি দশ থেকে সাতশত গুণ পর্যন্ত সওয়াব লিখে থাকি। যখন সে কোন পাপের কাজ করার ইচ্ছা করে, কিন্তু তখনও তা করে নি, আমি তার বিরুদ্ধে কিছুই লিখি না। অতঃপর যদি সে তা করে তবে আমি তাতে একটি মাত্র পাপ লিখে থাকি।” শাইখাইন ও তিরমিযী আলোচ্য হাদীসখানা হযরত আবু হুরায়রা (রা)-এর সূত্রে বর্ণনা করেছেন।
৩. মহান ও মর্যাদাবান আল্ল­াহ তা’আলা বলেন, “হে আমার বান্দাগণ! তোমরা প্রত্যেকেই পথভ্রষ্ট, শুধুমাত্র সেই ব্যক্তি ছাড়া যাকে আমি পথ দেখিয়েছি। অতএব তোমরা আমারই নিকট সৎপথ প্রার্থনা কর। আমি তোমাদেরকে সৎ পথে পরিচালিত করব। আর তোমরা প্রত্যেকেই ফকীর, কেবল সেই ব্যক্তি ছাড়া যাকে আমি সম্পদশালী করেছি। অতএব, আমার নিকট প্রার্থনা কর, আমি তোমাদেরকে রিযক দান করব, আর তোমরা প্রত্যেকেই পাপী শুধু সেই ব্যক্তি ছাড়া যাকে আমি ক্ষমা করেছি। অতঃপর যে তা জানে যে, আমি ক্ষমা করতে সক্ষম এং তারপর আমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে। আমি তাকে ক্ষমা করে দেই এবং আমি কারও মুখাপেক্ষী নই। আর যদি তোমাদের পূর্ববর্তীগণ, তোমাদের পরবর্তীগণ, তোমাদের জীবিতগণ, তোমাদের মৃতগণ, তোমাদের সজীবগণ ও শুদ্ধগণ সকলে মিলিত হয়ে আমার বান্দাদের মধ্যে যে সবচেয়ে বেশি পাপী, তার মতো কঠোর গুনাহগার হয়ে যায়, তবে তাতে আমার রাজ্যে একটি মাছির পাখা পরিমাণও কমবে না। আর যদি তোমাদের পূর্ববর্তীগণ, তােমাদের পরবর্তীগণ, তোমাদের জীবিতগঠ, তোমাদের মৃতগণ, তোমাদের তরুণগণ ও তোমাদের বৃদ্ধগণ কোন একস্থানে মিলিত হয়, তৎপর তোমাদের প্রত্যেক ব্যক্তি তার চরম কাম্য পরিমাণ বস্তু প্রার্থনা করে, আর আমি তোমাদের প্রত্যেক প্রার্থীকে দান করি, তারে আমার রাজ্যে বিন্দুমাত্রও ঘাটতি দেখা দিবে না। যেমন সমুদ্রের পানি কমবে না যদি তোমদের কেউ সমুদ্রের পাশ দিয়ে অতিক্রম করে তারপর তাতে সূঁচ ডুবিয়ে তা উঠিয়ে নেয়। কারণ, আমি একক দাতা ও মর্যাদাশালী; আমি যা ইচ্ছা করি তাই করে থাকি। আমার দান আমার আদেশমাত্র এবং আমার শাস্তি— আমারই আদেশ মাত্র। যখন আমি কোন কাজ করতে ইচ্ছা করি, তখন তার ব্যাপারে কেবল এ উক্তিই করা হয়- ‘হয়ে যাও’ আর সাথে সাথেই তা হয়ে যায়।” হান্নাদ ও তিরমিযী আলোচ্য হাদীসখানা হযরত আবু যর (রাঃ)-এর সূত্রে উল্লখ করেছেন।

৪. নিশ্চয়ই শয়তান বলল, “হে প্রতিপালক! তোমার ইজ্জতের কসম, আমি নিশ্চয়ই তোমার বান্দাদেরকে পথভ্রষ্ট করতে থাকব যতক্ষণ তাদের শরীরে প্রাণ বিদ্যমান থাকে।” অতঃপর আল্ল­াহ তা’আলা বললেন, “আমার ইজ্জত ও মহত্তে¡র কসম, আমি তাদেরকে ক্ষমা করতে থাকব যে পর্যন্ত তারা আমার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকে।” ইমাম আহমাদ আলোচ্য হাদীসখানা হযরত আবু সাঈদ (রা)-এর সূত্রে উল্ল­খ করেছেন।
( বিশ্বাসঘাতক  শয়তানের  হিংসাত্মক  ওয়াদার জবাবে আল্লাহ তাঁর বান্দার প্রতি তার  অসীম  দয়া ও  ক্ষমার  ওয়াদা  অতিশয় দৃঢ়তার সাথে ঘোষণা করেছেন। ইমাম আহমদও আলোচ্য হাদীসটি কয়েকটি শাব্দিক পার্থক্য সহকারে বর্ণনা করেছেন।]

৫. নিশ্চয়ই কোন বান্দা পাপ করে, তারপর বলে, “হে আমার প্রতিপালক! আমি পাপ করেছি, আমাকে ক্ষমা করুন।” তখন তার প্রতিপালক বলেন, “আমার বান্দা কি জানে যে, তার এরূপ একজন প্রতিপালক আছেন যিনি তাকে ক্ষমা করেন এবং তার ডাকে সাড়া দেন?” তিনি বলেন, “আমার বান্দাকে ক্ষমা করে দিলাম।” অতপর যতদিন আল্ল­াহ ইচ্ছা করেন, ততদিন সে পাপ থেকে বিরত থাকে। তারপর পুনরায় যে পাপ করে এবং বলে, “হে অমার প্রতিপালক! আমি আর একটি পাপ করে ফেলেছি, আপনি আমাকে ক্ষমা করুন।” তখন তার প্রভু বলেন, “আমার বান্দা কি জানে যে, তার এরূপ একজন প্রতিপালক আছেন যিনি পাপ মোছন করেন এবং তার ডাকে সাড়া দেন? সুতরাং আমি নিশ্চয়ই তাকে ক্ষমা করে দেই।” অতঃপর সে তার ইচ্ছানুরূপ আমল করুক। ঈমাম আহমদ ও শায়খাইন হযরত আবূ হুরায়রা (রা)-এর সূত্রে আলোচ্য হাদীসখানা বর্ণনা করেছেন।

৬. এক ব্যক্তি বলল, মহান আল্ল­াহর কসম, আল্ল­াহ অমুক ব্যক্তিকে ক্ষমা করবেন না। আল্ল­াহ বললেন, “কোন ব্যক্তি আমার নামে কসম করে যে, আমি অমুককে মাফ করব না? আমি নিশ্চয়ই অমুক ব্যক্তিকে ক্ষমা করে দিয়েছি এবং তোমার আমল নষ্ট করে দিয়েছি।” ইমাম মুসলিম আলোচ্য হাদীসখানা হযরত জুনদুব (রা)-এর সূত্রে বর্ণনা করেছেন।
[আলোচ্য হাদীস এটাই প্রমাণ করতেছে যে, আল্ল­াহ তা’আলা তাঁর এরূপ পাপী বান্দাকেও ক্ষমা করতে পারেন, যে অন্য মানুষের দৃষ্টিতে ক্ষমার অযোগ্য।]

৭. এক ব্যক্তি নামায আদায়রত ছিল। যখন সে সিজদা করল, তখন অপর এক ব্যক্তি আগমন করল এবং তার ঘাড়ে আরোহণ করল। নিচের ব্যক্তি বলল, “আল্ল­াহর কসম! আল্ল­াহ তোমাকে কখনও ক্ষমা করবেন না।” তখন মহান ও মর্যাদাবান আল্ল­াহ বললেন, “আমার বান্দা আমার কসম করে বলেছে যে, আমি আমার বান্দাকে ক্ষমা করব না। কিন্তু আমি নিশ্চয়ই তাকে ক্ষমা করে দিয়েছি।” তিবরাণী আলোচ্য হাদীসখানা ইবনে মাসউদ (রা)-এর সূত্র বর্ণনা করেছেন।

৮. নিশ্চয়ই কোন বান্দা মহান ও মর্যাদাবান আল্ল­াহর সন্তুষ্টি খুঁজতে থাকে। অতঃপর সে তাতে লেগে থাকে। তখন মহান ও মর্যাদাবান আল্ল­াহ বলেন, “হে জিবরাঈল! আমার অমুক বান্দা আমাকে সন্তুষ্ট করতে চায়। (তুমি জেনে রাখ যে,) নিশ্চয়ই তার ওপর আমার রহমত রয়েছে”- তখন হযরত জিবরাঈল ঘোষণা করে বললেন, “অমুকের ওপর আল্ল­াহর রহমত রয়েছে।” তখন সে উক্তি আরশের বহনকারীগণ ও তাদের পার্শ্ববর্তী ফেরেশতাগণ বলতে থাকে, এমন কি সপ্তম আকাশের অধিবাসীগণ এ কথাগুলো ঘোষণা করে। তারপর সে (জিবরাঈল) দুনিয়ায় নেমে আসে। ইমান আহমদ আলোচ্য হাদীসখানা হযরত সাওবান (রা)-এর সূত্রে বর্ণনা করেছেন।
৯. বনী ইসরাঈলদের দুই ব্যক্তি পরস্পর বন্ধু ছিল, একজন সাধারণ এবং অপর ব্যক্তি পাপী। সৎউদ্দেশ্য সাধনকারী ব্যক্তি পাপী ব্যক্তিকে সর্বদা বলত, “তুমি তা থেকে বিরত হও।” সে উত্তরে বলত, “তুমি আমাকে আমার প্রতিপালকের হাতে ছেড়ে দাও।” এমনকি একদিন সেই সৎসাধক সে পাপীকে এমন কোন গুনাহয় লিপ্ত দেখল, যা তার নিকট অত্যন্ত মারাত্মক বলে বোধ হলো। আবার সে বলল, “তুমি গুনাহ থেকে বিরত হও।” তখন সে বলল, “তুমি আমাকে আমার প্রভুর হাতে ছেড়ে দাও, তোমাকে কি আমার ওপর দারোগা করে প্রেরণ করা হয়েছে?” জবাবে সে বলল, “”আল্ল­াহর কসম! আল্ল­াহ তোমাকে কখনও ক্ষমা করবেন না এবং তোমাকে বেহেশতে প্রবেশ করাবেন না।” অতঃপর আল্ল­াহ তাদের নিকট ফেরেশতা প্রেরণ করলেন, তিনি উভয়ে প্রাণ বের করে নিলেন। তারপর এই দুই ব্যক্তি আল্ল­াহর নিকট একত্রিত হল। তখন আল্ল­াহ পাপী ব্যক্তিকে বললেন, “তুমি আমার রহমতের বলে বেহেশতে প্রবেশ কর।” আর অপর বান্দাকে বললেন, “তুমি কি আমার বান্দা থেকে আমার রহমত বাঁধা দেবার ক্ষমতা রাখ?” সে বলল, ‘না; হে আমার প্রতিপালক!’ আল্ল­াহ বললেন, “তাকে জাহান্নামে নিয়ে যাও।” ইমাম আহমদ ও আবু দাউদ আলোচ্য হাদীসখানা হযরত আবূ হুরায়রা (রা)-এর সূত্রে উলে­খ করেছেন। অলোচ্য হাদীসখানা সামান্য শাব্দিক পার্থক্য সহকারে উক্ত ইমামদ্বয় অন্য সনদেও উল্লে­খ করেছেন।

১০. হযরত রসূলে মাকবুল সল্ল­াল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্ল­াম বলেন, “ওহে, (সাহাবাগণ) আমি কি তোমাদের নিকট বনী ইসরাঈল সম্প্রদায় ভুক্ত দু’ব্যক্তির ঘটনা আলোচনা করব না? তাদের একজন নিজের আত্মার বিরুদ্ধে অমিতাচার করত। আর দ্বিতীয় ব্যক্তি এরূপ ছিল যে, বনী ইসরাঈল  তাকে  ধর্ম-কর্ম,  বিদ্যায় ও  চরিত্র-গুণে তাদের শ্রেষ্ঠতম ব্যক্তি বলে জানত। অতঃপর তার নিকট তার সাথীর বিষয় উল্লেখ করা হলে সে বলল, “ আল্ল­াহ কখনও তাকে ক্ষমা করবেন না।” মহান আল্ল­াহ তখন ফেরেশতাগণকে বললেন, “সে কি জানে না যে, আমি দয়ালুদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ? সে কি জানে না, আমার রহমত আমার রাগের সীমা অতিক্রম করে গেছে? অতএব আমি এ ব্যক্তির জন্য রহমত ওয়াজিব (আবশ্যক) করলাম, আর (উক্তিকারী) ব্যক্তির ওপর শাস্তি।” অতএবে আল্লাহ তা’আলা প্রসঙ্গে শপথ করিও না। আবু নুয়াইম ও ইবনু আসাকির আলোচ্য হাদীসখানা কাতাদা (রা) সূত্রে বর্ণনা করেছেন।
১১. মহান ও মর্যাদাবান আল্ল­াহ তা’আলা হযরত দাউদ (আ)-এর ওপর ওহী নাযিল করলেন,- “আমার ইয্যত ও মর্যাদার কসম! আমার এরূপ কোন বান্দা নেই যে, সে আমার সৃষ্টজীবকে ছেড়ে আমাকে আঁকড়িয়ে ধরে আমার আশ্রয় চায়, বরং আমি তার নিয়ত থেকে তা জানতে পারি, তখন আকাশসমূহ ও তাতে যা কিছু আছে সকলে মিলে তাকে প্রতারণার জালে আবদ্ধ করে ফেলে। কিন্তু এর ভেতর থেকে আমি তার মুক্তির পথ প্রশস্ত করে দেই। আর এরূপ কোন বান্দা নেই যে, সে আমাকে ছেড়ে কোন সৃষ্টির আশ্রয় লয়, আমি তার নিয়ত (নিগূঢ় অভিপ্রায়) থেকে জানতে পারি,- বরং আকাশের যাবতীয় পন্থা তার সম্মুখে কেটে দিই। আর তার কামনাকে তার পদতলে মজবুত করে বেঁধে রাখে। আর এরূপ কোন বান্দা নেই, যে আমার আদেশের পূর্বেই তাকে অনুগত করা না হয়। কোন কিছু চাওয়ার পূর্বেই আমি তাকে দান করি। আর আমার নিকট ক্ষমা চাওয়ার পূর্বেই আমি তাক ক্ষমা করে দেই।” তাম্মাম আলোচ্য হাদীসখানা হযরত আবদুর রহমান ইবনে মালিক-এর সূত্রে এবং তিনি তাঁর পিতার সূত্রে তা বর্ণনা করেছেন।

১২. মহান আল্ল­াহ বলেছেন, “আমি অতি করুণাময় ও মহান ক্ষমাকারী। এটা সম্ভব নয় যে, আমি একজন মুসলমান বান্দার অপরাধমূলক কাজসমূহ দুনিয়াতে গোপন রাখব, তারপর তার যে সব অপরাধমূলক আচরণ প্রকাশ করে দিয়ে তাকে অপমানিত করব। আমার বান্দার পাপ মোচন করতে থাকি যে পর্যন্ত যে ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকে।” হাকেম ও তিরমিযী আলোচ্য হাদীসখানা বর্ণনা করেছেন।

১৩. যখন কোন বান্দা নিজের বিছানায় অথবা মাটিতে তার শয়নের স্থানে শয়ন করে, অতঃপর কোন রাত্রিতে তার ডানে বা বামে পার্শ্ব পরিবর্তন করে তারপর (পাশ ফেরানোর সময়) বলে, “আশহাদু আল লা-ইলাহা ইল্লল্ল­াহু ওয়াহদাহু লা-শারীকালাহু লাহুল মুলকু ওয়ালাহুল হামদু ইউহ্য়ী ওয়া ইউমীতু ওয়াহুয়া হাইয়্যুন লা ইয়ামূতু, বিয়াদিহিল খায়রু ওয়াহুয়া আলা কুলি­ শাইয়্যিন কাদীর,” তখন মহান ও পরাক্রমশালী আল্ল­াহ তাঁর ফেরেশতাগণকে বলেন, “তোমরা আমার বান্দার প্রতি লক্ষ্য কর- সে এ অবস্থায়ও আমাকে ভোলে নাই। আমি তোমাদেরকে সাক্ষী রাখতেছি, আমি তার ওপর রহমন বর্যণ করেছি।” ইবনুস সুন্নী আলোচ্য হাদীসখানা হযরত আনাস (রা)-এর সূত্রে বর্ণনা করছেন।

১৪. মহান আল্লাহ বলেন, “আমার যে বান্দা আমার দিকে দু’হাত উঠায় তাকে শূন্য হাতে ফিরিয়ে দিতে আমি লজ্জা অনুভব করি।” ফেরেশতাগণ আরয করেন, “হে আমাদের প্রতিপালক! সে এর যোগ্য নয়।” মহান আল্ল­াহ বলেন, “কিন্তু আমি তো তাকওয়া ও ক্ষমার অধিকারী।” আমি তোমাদেরকে সাক্ষী রাখতেছি যে, আমি নিশ্চয়ই তাকে মাফ করে দিয়েছি। হাকেম ও ইমাম তিরমিযী হযরত আনাস (রা)-এর সূত্রে আলোচ্য হাদীসখানা বর্ণনা করেছেন।

১৫. মহান ও মর্যাদাবান আল্ল­াহ বলেন, “যদি তোমার আমার রহমত কামনা কর, তবে আমার সৃষ্টির প্রতি রহম কর।” আবু শায়খ আলোচ্য হাদীসখানা আবু বকর (রা)-এর সূত্রে উলে­খ করেছেন।

১৬. মহান ও মর্যাদাবান আল্ল­াহ বলেছেন,- “আমার ইজ্জত ও মহত্তে¡র কসম! আমি আমার বান্দার জন্য দু’টি নিরাপত্তা ও দু’টি ভয় একত্র করব না। যদি সে দুনিয়ায় আমা থেকে নির্ভয় হয়ে যায় তবে আমি তাকে সেদিন ভীত করব, যে দিন আমি আমার বান্দাগণকে একত্র করব। আর যদি সে পৃথিবীতে আমাকে ভয় করে, তবে সেদিন তাকে নিরাপত্তা দান করব যেদিন আমার বান্দাগণকে একত্রিত করা হবে।” আবু নুয়াইম আলোচ্য হাদীসখানা শাদ্দাদ ইবনে আওস (রা)-এর সূত্রে উলে­খ করেছেন।
১৭. নিশ্চয়ই মহান ও পরাক্রমশালী আল্ল­াহ শেষ বিচারের দিন মু’মিনকে নিকটবর্তী করবেন ও তার উপর নিজের কাঁধ স্থাপন করবেন এবং তাকে মানুষের নিকট থেকে ঢেকে রাখবেন। তারপর তার দ্বারা তার পাপগুলো স্বীকার করাবেন এবং বলবেন, “তুমি কি এ পাপের কথা স্মরণ করতে পার? তুমি কি ঐ গুনাহ স্বীকার কর?” সে তখন বলবে, “হ্যাঁ আমার প্রভু!” এমন কি যখন এরূপে যে গুনাহ স্বীকার করবে এবং তখন মনে মনে ভাববে যে, সে ধ্বংস হয়ে গেছে, তখন আল্ল­াহ বলবেন, আমি নিশ্চয়ই পৃথিবীতে তোমার জন্য এগুলো ঢেকে রেখেছি, আর আমি এগুলো তোমাকে আজ ক্ষমা করে দিলাম। অতপর তার ডান হাতে তার নেকীর আমলনামা দেওয়া হবে। অন্যপক্ষে কাফির ও মুনাফিকদের ব্যাপারে সাক্ষিগণ বলবে, “তারা সেই সকল লোক, যারা তাদর প্রভুর বিরুদ্ধে মিথ্যা বলেছিল। সাবধান! অত্যাচারীদের প্রতি আল্ল­াহর অভিশাপ” আহমদ ও শায়খাইন আলোচ্য হাদীসখানা আব্দুল­াহ ইবনে উমর (রা)-এর সূত্রে বর্ণনা করেছেন।
[মু’মিনের প্রতি আল্ল­াহ এত দয়াপ্রবণ যে, তিনি ইহকালে তার দোষ-ত্রুটি ঢেকে রাখেন এবং আখিরাতে তা ক্ষমা করে দেন।]

১৮. নিশ্চয়ই মহান ও মর্যাদাবান আল্ল­াহ শেষ বিচারের দিন বান্দাকে জিজ্ঞাসা করবেন, এবং বলবেন, “যখন তুমি মন্দ (কাজ) ঘটতে দেখেছিলে তখন তাতে বাধা দাও নাই কেন?”  রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লা­াহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আল্ল­াহ সে প্রশ্নের জবাব বান্দার মনে উদিত করে দেবেন। সে বলবে, “হে আমার প্রভু! আমি মানুষদেরকে ভয় করেছিলাম এবং তোমার রহমতের আশা পোষণ করেছিলাম।” বায়হাকী আলোচ্য হাদীসখানা হযরত আবু সাঈদ (রা)-এর সূত্রে বর্ণনা করেছেন।

১৯. নিশ্চয়ই মহান আল্ল­াহ বেহেশতবাসীগণকে সম্বোধন করবেন। তারা তখন বলবে, “তোমার খিদমতে আমরা হাজির আছি, হে আল্ল­াহ! আমরা তোমার প্রশংসা করি।” তখন আল্ল­াহ বলবেন, “তোমরা কি সন্তুষ্ট হয়েছ?” তারা বলবে, “আমরা কেন সন্তুষ্ট হব না।” আপনি আমাদেরকে এরূপ দান করেছেন যা আর কাউকে দেননি। আল্ল­াহ তা’আলা বলবেন, “ আমি কি তোমাদেরকে এর চেয়ে উত্তম বস্তু দিবনা?” তারা জিজ্ঞাসা করবে,  “হে আমাদের প্রতিপালক! তা অপেক্ষা উত্তম আর কি বস্তু আছে?” তখন আল্ল­াহ বলবেন, “আমি আমার সন্তুষ্টি তোমাদের ওপর নাযিল করব, অতএব এর পর কোন কঠোরতা আরোপ করা হবে না।” আহমদ ও শায়খাইন আলোচ্য হাদীসখানা আবু সাঈদ (রা)-এর সূত্রে বর্ণনা করেছেন।

২০. হযরত মূসা ইবনে ইমরান (আঃ) আবেদন করলেন, “হে প্রতিপালক! তোমার বান্দাদের মধ্যে কে তোমার নিকট সর্বাপেক্ষা প্রিয়?” আল্ল­াহ তা’আলা বললেন, “সেই ব্যক্তি, যে প্রতিশোধ নিতে সক্ষম হওয়া স্বত্তে¡ও ক্ষমা করে দেয়।” বায়হাকী আলোচ্য হাদীসখানা হযরত আবূ হুরায়রা (রা)-এর সূত্রে উলে­খ করেছেন।

২১. মহান আল্র­াহ বলেন, “নিশ্চয়ই আমি সে বান্দা ও বাঁদী থেকে লজ্জিত- যারা ইসলামে থেকে বড় হয়েছে। অর্থাৎ যে বান্দার দাঁড়ি ইসলামে থেকে সাদা হয়েছে এবং যে বাঁদীর চুল ইসলামে থেকে সাদা হয়েছে। তারপরও কি করে আমি তাদেরকে আগুনে জ্বালিয়ে শাস্তি দেব?” আবু ইয়ালা আলোচ্য হাদীসখানা হযরত আনাস (রা)-এর সূত্রে বর্ণনা করেছেন।

২২. হযরত রসূলে মাকবুল সাল্লাল্লা­াহু আলাইহি ওয়াসাল্ল­াম বলেন, “হযরত জিবরাঈল আমাকে মহান ও মর্যাদাবান আল্ল­াহ প্রসঙ্গে খবর দিয়েছেন,- আল্ল­াহ বলেছেন, “আমার মহত্ব আমার একত্ব ও উচ্চ পদের কসম, আমার সাথে আমার বান্দাদের যে প্রয়োজন রয়েছে তার কসম এবং আমার আরশের উপর আমার আসন গ্রহণের কসম !- নিশ্চয়ই আমি আমার সে দাস ও দাসীকে শাস্তি দিতে লজ্জাবোধ করি যারা ইসলামে অবস্থান করে বৃদ্ধ হয়েছে। অতঃপর রসূলে আকরাম সাল্লল্ল­াহু আলাইহি ওয়াসাল­াম ক্রন্দন করতে লাগলেন। তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হলো, “হে আল্ল­াহর রাসূল! আপনাকে কিসে কাঁদাচ্ছে ?” তিনি বললেন,  “আমি সে ব্যক্তির জন্য ক্রন্দন করি যার জন্য আল্ল­াহ লজ্জাবোধ করেন। অথচ আল্ল­াহ তা’আলার নিকট সে লজ্জিতও হয় না।” খালীল ও রাফিয়ি আলোচ্য হাদীসখানা হযরত আনাস (রা)-এর সূত্রে বর্ণনা করেছেন। হযরত আনাস (রা) বর্ণিত হাদীসটি মুহাদ্দিস রাফিয়ী কয়েকটি শাব্দিক পরিবর্তন সহকারেও বর্ণনা করেছেন।

মহান আল্ল­াহর রহমত ও ক্ষমা সম্পর্কে সুধারণা পোষণ সম্পর্কিত হাদীসে কুদসীসমূহ (বাংলা অর্থ)

মানবজাতির প্রত্যেকের কর্তব্যের মধ্যে রোগাক্রান্ত ব্যক্তিকে দেখতে যাওয়া ও তার সেবাযত্ন করা অন্যতম কর্তব্য। এটা ইসলামী সৌজন্যবোধের বিশেষ অঙ্গ। রোগাক্রান্ত ব্যক্তিকে দেখার সময় তার রোগমুক্তির জন্য দু’আ করাও সুন্নত। অবশ্য সংক্রামক ব্যাধি, যেমন-বসন্ত, কলেরা, প্লেগ প্রভৃতির ক্ষেত্রে নিজ নিজ এলাকার জনগণের জন্য এ দায়িত্ব আদায় করা রাসূলে মাকবুল সাল্লাল্ল­াহু আলাইহি ওয়া সাল্ল­াম-এর নির্দেশ। রোগী দর্শনকারীদের মঙ্গলের জন্য ফেরেশতাগণ আল্ল­াহর দরবারে সকালে ও সন্ধ্যায় প্রার্থনা করে থাকেন।
সর্বাবস্থায় ধৈর্যধারণ আল্ল­াহর নিকট অতি প্রিয় গুণ। কারণ ধর্যের ভিতর দিয়ে মনুষ্যত্বের পরীক্ষা হয়। বিশেষতঃ বিপদে ধৈর্যধারণ করা দুনিয়ার চাবিকাঠি। মহান আল্র­াহ ধৈয্যশীলদের সঙ্গী। হযরত লুকমান তাঁর পুত্রকে উপদেশ দেওয়ার সময় বলেছেন- “তোমার উপর যে কোন বিপদ আসলে, তুমি তাতে ধৈর্যধারণ কর। এটি অতি মহৎ কাজ।” (সূরা লুকমান) মূলতঃ সবর বা ধৈর্যই সামাজিক জীবনে মানবিক বন্ধনকে স্থির রাখে এবং আত্মাকে বিশুদ্ধ করে আল্ল­াহ তা’লার নৈকট্যলাভে সহায়তা করে।

১. যখন কোন বান্দা অসুস্থ হয় তখন আল্ল­াহ তাঁর ফেরেশতাদের প্রতি ওহী নাযিল করেন, “আমি  আমার  বান্দাকে   আমার জিন্দানসমূহের একটিতে বন্দী করেছি। অতঃপর যদি আমি তার প্রাণ হরণ করি, আমি তাকে ক্ষমা করব। আর যদি তাকে রোগমুক্ত করি, তবে যে এমন অবস্থায় উঠে বসবে যেন তার কোন পাপ নেই।” হাকেম ও তিবরানী আলোচ্য হাদীসখানা হযরত আবু উমামা (রা)-এর সূত্রে বর্ণনা করেছেন।

২. মুসলমানদের মধ্যে এমন কিছু ব্যক্তি যাকে দৈহিক বিপদের মাধ্যমে বিপদগ্রস্ত করা হয় তার সম্পর্কে মহান ও মর্যাদাবান আল্ল­াহ বান্দার আমল লিপিবদ্ধকারী ফেরেশতাকে ডেকে বলেন, প্রতিদিন ও প্রতিরাত এ বান্দার আমলনামায় যে পরিমাণ সাওয়াব লিখ যা সে সুস্থ অবস্থায় অর্জন করত এবং ততদিনই এমন করে যাও, যতদিন সে আমার বন্ধনে আবদ্ধ থাকে। ইমাম আহমদ আলোচ্য হাদীসখানা আব্দুল­াহ ইবনে উমর (রা)-এর সূত্রে বর্ণনা করেছেন।
[আলোচ্য হাদীস স্পষ্টভাষায় ঘোষণা করেছে যে, অসুস্থ ব্যক্তির প্রতি আল্ল­াহ বিশেষ সহানুভূতিশীল; এমন কি আল্ল­াহ তাকে সুস্থ অবস্থায় কৃতকর্মের সমপরিমাণ নেকী দান করে থাকেন, এটা তার দৈহিক ব্যাধির ক্ষতিপূরণস্বরূপ।]

৩. মহান আল্ল­াহ বলেছেন, “নিশ্চয়ই আমি যখন আমার কোন বান্দার সর্বাপেক্ষা প্রিয়বস্তু দুটি চক্ষু হরণ করি, তারপর সে ধৈর্যধারণ করে এবং নেকীর আশা পোষণ করে, তাকে আমি বেহেশত ছাড়া অন্য কোন পুরস্কার দিয়ে সন্তুষ্ট হতে পারি না।” তিবরানী ও হাকেম আলোচ্য হাদীসখানা আব্দুল­াহ ইবনে আব্বাস (রা)-এর সূত্রে বর্ণনা করেছেন।
[কতিপয় হাদীসে অন্ধ মু’মিন ব্যক্তির প্রতি আল্ল­াহর বিশেষ সহানুভূতির উল্লে­খ রয়েছে। অন্ধ মু’মিনকে আল্ল­াহ তা’আলা জান্নাত দান করবেন বলে স্পষ্ট ইঙ্গিত করেছেন।]

৪. হাদীসে কুদসীতে নিশ্চয়ই আল্ল­াহ তা’আলা বলেন, “যখন আমি আমার বান্দর দৃষ্টিশক্তি পৃথিবীতে হরণ করে লই, তখন তার পরিবর্তে আমার কাছে বেহেশত ছাড়া অন্য কিছুই নয়।” ইমাম তিরমিযী আলোচ্য হাদীসখানা হযরত আনাস (রা)-এর সূত্রে বর্ণনা করেছেন।

৫. মহান ও মর্যাদাবান আল্ল­াহ বলেন, “আমার মু’মিন বান্দার জন্য আমার নিকট বেহেশত ছাড়া অন্য কোন প্রতিদান নেই যখন আমি দুনিয়াবাসীদের মধ্যে থেকে তার প্রিয়তম বন্ধুকে ছিনিয়ে নেই এবং তারপরও সে আমার প্রতি আস্থাবান থাকে।” ইমাম আহমদ ও বুখারী আলোচ্য হাদীসখানা হযরত আবূ হুরায়রা (রা)-এর সূত্রে বর্ণনা করেছেন।

৬. মহান আল্ল­াহ বলেন,  “আমি আমার কোন বান্দার প্রিয়তম বস্তু কেড়ে নেই না। কেড়ে নিলে তার প্রতিদান বেহেশত ছাড়া অন্য কিছুই আমার পছন্দনীয় নয়।” হযরত আবু নুয়াইম আলোচ্য হাদীসখানা হযরত আনাস (রা)-এর সূত্রে বর্ণনা করেছেন।

৭. বরকতময় মহান আল্ল­াহ তা’আলা বলছেন, “যখন আমি আমার বান্দাদের মধ্য থেকে কোন বান্দার প্রতি কোন বিপদ প্রেরণ করি তার দেহের ওপর অথবা তার সন্তানের ওপর অথবা তার সম্পদের ওপর, তারপরও সে উত্তম সবরের সাথে সে বিপদকে গ্রহণ করে, শেষ বিচারের দিন আমি লজ্জা অনুভব করি যে, কিরূপে তার জন্য দাঁড়িপাল­া স্থাপন করব এবং তার আমলনামা তার সামনে খুলে ধরব।” হাকেম ও তিরমিযী আলোচ্য হাদীসখানা হযরত আনাস (রা)-এর সূত্রে বর্ণনা করেছেন।

৮. নিশ্চয়ই মহান আল্ল­াহ শেষ বিচারের দিন বলবেন, “হে বনী আদম! আমি অসুস্থ হয়েছিলাম, কিন্তু তুমি আমার সেবা করনি।” বান্দা আরয করবে, “হে আমার প্রতিপালক! আমি কিরূপে আপনার রোগ সেবা করব, অথচ আপনি বিশ্ব জগতের প্রতিপালক?” তিনি বলবেন, “তুমি জানতে না যে, আমার অমুক বান্দা অসুস্থ হয়েছিল, কিন্তু তুমি তাকে দেখতে যাওনি। তুমি কি জান না, যদি তুমি তার সেবা করতে তাহলে তুমি আমাকে তার নিকটেই পেতে।”
“হে বনী আদম! আমি তোমার নিকট খাবার চেয়েছিলাম, কিন্তু তুমি আমাকে আহার করাও নি।” বান্দা আবেদন করবে, “হে আমার প্রভু! কিরুপে আমি তোমাকে আহার করাব? তুমি বিশ্ব জগতের প্রতিপালক।” তিনি বলবেন, তোমার কি জানা নেই যে, আমার অমুক বান্দা তোমার কাছে খাবার চেয়েছিল, কিন্তু তুমি তাকে খাবার দাও নি। তুমি কি জানতে না যে, তুমি যদি তাকে খাওয়াতে তবে তুমি তা আজ আমার কাছে পেতে।
“হে বনী আদম! আমি তোমার কাছে পানীয় চেয়েছিলাম, কিন্ত তুমি আমাকে পানীয় দাও নি।” বান্দা আবেদন করবে, “হে আমার প্রভু! আমি কিরূপে তোমাকে পান করাব, তুমি বিশ্ব জগতের প্রতিপালক।” তিনি বলবেন, “আমার অমুক বান্দা তোমার নিকট পানীয় চেয়েছিল, কিন্তু তুমি তাকে  পান  করাও নি।  তুমি যদি  তাকে পানি পান করাতে, তবে আজ নিশ্চয়ই  তা  আমার  কাছে  পেতে।” ইমাম মুসলিম আলোচ্য হাদীসখানা হযরত আবূ হুরায়রা (রা)-এর সূত্রে বর্ণনা করেছেন।

৯. মহান আল্লাহ বলেন, “বিপদগ্রস্থদেরকে আমার আরশের নিকটবর্তী কর। নিশ্চয়ই আমি তাদেরকে ভালোবাসি।” দায়লামী আলোচ্য হাদীসখানা কর্ণনা করেছেন।
১০. যখন কোন বান্দার সন্তান  বৃত্যুবরণ করে, তখন আল্র­াহ তার ফেরেশতাগণকে ডেকে জিজ্ঞাসা করেন, “তামরা কি আমার বান্দার সন্তানদের প্রাণ নিয়েছ?” তারা বলেন, “হ্যাঁ!” তখন আল্ল­াহ বলেন,  “তোমরা কি তার অন্তরের ফুল ছিনিয়ে নিয়েছ?” তারা বলেন, “হ্যাঁ!” তখন আল্ল­াহ তা’আলা বলেন, “আমার বান্দা কি বলেছিল?” তারা বলেন, যে তোমার প্রশংসা করেছিল (আলহামদুলিল­াহ এবং ইন্নালিল­াহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। তখন মহান আল্ল­াহ বলবেন, “আমার এ বান্দার জন্য বেহেশতে একখানা ঘর বানাও এবং তার নাম রাখ- ‘বাইতুল হামদ’(প্রশংসার ঘর)।” ইমাম তিরমিযী আলোচ্য হাদীসখানা হযরত আবূ মূসা (সা)-এর সূত্রে বর্ণনা করেছেন।

১১. নিশ্চয়ই হযরত জিবরাঈল (আঃ) আদম সন্তানদের প্রয়োজন পূর্ণ করার জন্য দায়িত্বপ্পাপ্ত রয়েছেন। অতঃপর যখন কোন কাফির ব্যক্তি দু’আ করে তখন আল্ল­াহ তা’আলা বলেন, “হে জিবরাঈল! তার প্রয়োজন পূর্ণ করে দাও। আমি তার আহবান শুনতে চাই না।” আর যখন কোন মু’মিন বান্দা দু’আ করে তখন আর্ল­াহ বলেন, “হে জিবরাঈল! তার প্রয়োজন বন্ধ রাখ, কারণ আমি তার আহবান শুনতে ভালবাসি।” ইবনুন নাজ্জার আলোচ্য হাদীসখানা হযরত জাবির (রা)-এর সূত্রে বর্ণনা করেছেন।

১২. নিশ্চয়ই মু’মিন আল্ল­াহকে আহবান করে আর আল্ল­াহ তা’আলা তা পছন্দ করেন। অতঃপর তিনি বলেন, “হে জিবরাঈল, আমার (মু’মিন) বান্দার এ প্রয়োজন মিটিয়ে দাও এবং তা স্থগিত রেখে পেছনে ফেল, কারণ আমি তার আওয়াজ শুনতে ভালবাসি।” আর নিশ্চয়ই (পাপী) ব্যক্তি আল্ল­াহকে আহবান করে কিন্তু আল্ল­াহ তা ঘূণা করেন। তারপর আল্লাহ তা’আলা বলেন, “হে জিবরাঈল! আমার বান্দার প্রয়োজন মিটিয়ে দাও এবং তা তার জন্য দ্রুত সমাধা কর। কারণ আমি তার আওয়াজ শুনতে পছন্দ করি না।” ইবনু আসাকির আলোচ্য হাদীসখানা হযরত আনাস (রা)-এর সূত্রে বর্ণনা করেছেন।

১৩. কোন বান্দা যখন রোগাক্রান্ত হয়, তখন আল্ল­াহ তা’আলা তার নিকট দু’জন ফেরেশতা প্রেরণ করেন এবং বলেন, “দেখ এই রোগাক্রান্ত ব্যক্তি রাগে পরিদর্শকদেরকে কি বলে?” অতঃপর সে যদি তাদের প্রবেশকালে মহান আল্ল­াহর প্রশংসা করে তবে ফেরেশতাগণ তা আল্লহর নিকট নিয়ে যান। আর আল্ল­াহ তা জানেন। তখন আল্ল­াহ বলেন, “আমার বান্দার স্বপক্ষে আমার সিদ্ধান্ত এই যে, যদি আমি তার মৃত্যু ঘটাই তবে আমি তাকে বেহেশতে প্রবেশ করাব। আর যদি আমি তাকে রোগমুক্ত করি, তবে আমার দায়িত্ব ও বর্তব্য এই যে, আমি তার দেহের গোশত উত্তমতর গোশ্তে এবং তার রক্ত উত্তমতর রক্তে বদল করব এবং আমি তার পাপসমূহ মোচন করব।” দারু কুতনী হযরত আবু হুরায়রা (রা)-এর সূত্রে আলোচ্য হাদীসখানা বর্ণনা করেছেন।

১৪. প্রত্যেক মানুষ যে তার কোন ভাইকে আল্ল­াহর ওয়াস্তে দেখতে যায়, তাকে জনৈক সম্বোধনকারী ফেরেশতা এ বলে আকাশ থেকে ডেকে বলেন যে, “তুমি সুখী হও এবং তোমার জন্য জান্নাত সুখের হোক।” মহান ও প্রতাপশালী আল­াহ তখন তার আরশের ফেরেশতাদের ডেকে বলেন, “এক বান্দা আমার উদ্দেশ্যে তার ভাইয়ের সাথে সাক্ষাত করেছে। সুতরাং তাকে দাওয়াত করে খাওয়াবার দায়িত্ব আমার ওপর; আর আল্ল­াহ তা’আলা তাঁর এ দায়িত্ব পূর্ণ করার জন্য বেহেশত ছাড়া অন্য কোন দাওয়াত পছন্দর করেন না।” আবু ইয়ালা আলোচ্য হাদীসখানা হযরত আনাস (রা)-এর সূত্রে বর্ণনা করেছেন।
[আলোচ্য হাদীসটি রোগী দেখতে যাওয়া কিরূপ নেকীর কাজ এবং রোগীর সাক্ষাতকারীর প্রতি আল্ল­াহ তা’আলা কিরুপ সুপ্রসন্ন ও সদয় তার পরিপূর্ণ ব্যাখ্যা দান করেছেন। এ হককুল ইবাদ (বান্দার হক) পালনের পরিবর্তে আল্ল­াহ তা’আলা জান্নাত প্রদানের ওয়াদা করেছেন।]

১৫. মহান ও মর্যাদাবান আল্ল­াহ নেককারদের রক্ষক ফেরেশতাগণের প্রতি এ ওহী প্রেরণ করেন, “দুঃখের অবস্থায় আমার বান্দার বিরুদ্ধে তোমরা কোন কিছু লিখিও না।” দয়ালামী আলোচ্য হাদীসখানা হযরত আলী (রা)-এর সূত্রে বর্ণনা করেছেন।

১৬. নেকীর ভান্ডার তিনটি- সদকা গোপন রাখা, মুসিবত গোপন রাখা এবং রোগের ব্যাপারে অভিযোগ গোপন রাখা। আল্ল­াহ তা’আলা বলেন, “যখন আমি  আমার  বান্দাকে  কোন  বিপদ দ্বারা পরীক্ষা করি, তারপর সে ধৈর্যধারণ করে  এবং  আমার  বিরুদ্ধে  তার সাক্ষাতকারীদের নিকট কোন অভিযোগ করে না, তখন আমি তাকে বিপদমুক্ত করি এবং তার পূর্ববর্তী গোশত উত্তমতর গোশতে এবং তার পূর্ববর্তী রক্ত উত্তমতর রক্তে পরিবর্তন করে দেই। আর যদি তাকে ছেড়ে দেই, তবে তাকে এমনভাবে ছেড়ে দেই যে, তার কোন গুনহ থাকে না। আর যদি তার মৃত্যু ঘটাই, তবে আমার রহমতের দিকে তাকে টেনে নেই।” তিবরানী আলোচ্য হাদীসখানা হযরত আনাস (রা)-এর সূত্রে বর্ণনা করেছেন।

 

রোগীর সেবাযত্ন ও বিপদে ধৈর্যধারণ করা সম্পর্কিত হাদীসে কুদসীসমূহ (বাংলা অর্থ)

মানুষ নিজের রুচি অনুযায়ী সমভাবাপন্ন সঙ্গীর সঙ্গ পছন্দ করে থাকে। এ মূলনীতি অনুসারে মুসলমান পরস্পর অন্য ধর্মীয় মানুষের চেয়ে বেশি ভালবাসবে, এটাই স্বাভাবিক। আর একই পথের পথিকদের মধো ভালবাসা ও সৌহার্দ্য সৃষ্টির মূল কারণ হলো তাদের গন্তব্য স্থল একই। মুসলমানদের পরস্পরের সাথে প্রেম ও প্রীতির বন্ধনের মূল সূত্র ইসলাম।
মুসলমানদের পরস্পরের ভালবাসা শুধু মানুষের উদ্দেশ্যে মানুষকে ভালবাসা নয়, বরং আল্লাহর­ সন্তুষ্টির জন্য মানুষকে ভালবাসা। রসূলে মাকবুল সল্লাল্ল­াহু আলাইহি ওয়াসাল্র­াম-এর নির্দেশও তাই। দুনিয়ার সুখ-সুবিধা বা স্বার্থের খাতিরে মুসলমানের প্রেম ও ভালবাসা গড়ে উঠা নাজায়েয। শুধুমাত্র আল্ল­াহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে কারও সঙ্গে প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ হওয়াই তাদের পক্ষে আবশ্যক।
ঘৃণা পোষণের বিষয়েও ঠিক একই রকম। লৌকিব স্বার্থে উদবুদ্ধ হয়ে অথবা প্রবৃত্তির প্ররোচণায় কারও প্রতি ঘৃণা বা বৈরীভাব পোষণ করা নাজায়েয। তবে আল্ল­াহ ও তাঁর রসূলের বিরুদ্ধাচারী ব্যক্তির প্রতি ঘৃণা পোষণ করা মু’মিনের জন্য জায়েয ও স্বাভাবিক। আল্ল­াহ ও তাঁর রসূলের শিক্ষাও  তাই।

১. মহান আল্লাহ­ তা’আলা শেষ বিচারের দিন বলবেন, “ঐ সকল ব্যক্তি কোথায় যারা দুনিয়াতে আমার মহত্তে¡র দিকে লক্ষ্য রেখেই একে অপরকে ভালবাসত? আজ আমি তাদেরকে আমার ছায়াতলে আশ্রয় দান করব। আজ আমার ছায়া ছাড়া অন্য কোন ছায়া নাই।” ইমাম আহমদ ও ইমাম মুসলিম আলোচ্য হাদীসখানা হযরত আবু হুরায়রা (রা)-এর সূত্রে বর্ণনা করেছেন।

২. মহান আল্ল­াহ তা’আলা বলেছেন, “আমার উদ্দেশ্যে যারা পরস্পরকে বন্ধু করেছে তাদের জন্য আমার ভালবাসা নির্ধারিত হয়েছে। তাদেরকে শেষ বিচারের দিন, যে দিন আমার ছায়া ব্যতীত অন্য কোন ছায়া থাকবে না, আরশের তলে ছায়া দান করব।” ইবনুল আবিদ দুনিয়া উবাদা ইবনে সামিত (রা)-এর সূত্রে আলোচ্য হাদীসখানা বর্ণনা করেছেন।

৩. হাদীসে কুদসীতে আল্ল­াহ তা’আলা ইরশাদ করেছেন, “আমার উদ্দেশ্যে পরস্পরকে যারা ভালবাসে, আমার উদ্দেশ্যে পরস্পরের সাথে যারা উঠা-বসা করে, আমার উদ্দেশ্যে পরস্পরের সাথে যারা খরচ করে এবং আমার উদ্দেশ্যে পরস্পরকে যারা পরিদর্শন করে, আমার ভালবাসা তাদের জন্য নির্ধারিত হয়ে গিয়েছে।” ইমাম আহমদ ও ইবনে হাব্বান আলোচ্য হাদীসখানা হযরত মুয়ায (রা)-এর সূত্রে বর্ণনা করেছেন।

৪. আল্ল­াহ তা’আলা বলেছেন, “আমার ভালবাসা সে সকল মানুষের জন্য নির্ধারিত, যারা আমার খাতিরে পরস্পরের সাথে উঠা-বসা করে। আর আমার ভালবাসা সে সব মানুষের জন্য নির্ধারিত হয়েছে যারা আমার উদ্দেশ্যে পরস্পরের জন্য ধন-সম্পদ খরচ করে। আর আমার ভালবাসা সে সকল ব্যক্তির জন্য ধার্য হয়েছে, যারা আমার খাতিরে পরস্পরের সাথে সাক্ষাত করে।” তিবরাণী আলোচন্য হাদীসখানা উবাদাহ ইবনে সামিত (রা)-এর সূত্রে বর্ণনা করেছেন।

৫. মহান আল্ল­াহ তা’আলা বলেন, “নিশ্চয়ই আমি দুনিয়ার অধিবাসীগণকে শাস্তি দিতে ইচ্ছা করি। অতঃপর যখন আমি আমার ঘর আবাদকারী, আমার উদ্দেশ্যে পরস্পরের বন্ধুত্ব বন্ধনে আবদ্ধ ব্যক্তি ও খুব ভোরে আমার নিকট ক্ষমা প্রার্থনাকারীর প্রতি দৃষ্টিপাত করি, তখন আমি তাদের উপর থেকে সে শাস্তি দূর করে দেই।” ইমাম বায়হাকী আলোচ্য হাদীসখানা বর্ণনা করেছেন।

৬. মহান আল্ল­াহ তা’আলা বলেন, “নিশ্চয়ই আমি দুনিয়ার অধিবাসীগণকে শাস্তি দিতে ইচ্ছা করি। অতঃপর যখন আমি আমার ঘর  আবাদকারী,  আমার  উদ্দেশ্যে  পরস্পরের বন্ধুত্ব বন্ধনে আবদ্ধ ব্যক্তি ও খুব ভোরে আমার নিকট ক্ষমা প্রার্থনাকারীর প্রতি দৃষ্টিপাত করি, তখন আমি তাদের উপর থেকে সে শাস্তি দূর করে দেই।” ইমাম বায়হাকী আলোচ্য হাদীসখানা বর্ণনা করেছেন।

৭. এমন কোন যুবক, যে ইহকালের স্বাদ ও এর প্রমোদ ত্যাগ করে এবং তার যৌবনের প্রবণতার পরিবর্তে আল্ল­াহ তা’আলার আদেশ পালনকে গ্রহণ করে, আল্ল­াহ তাকে বাহাত্তর জন সত্যবাদী ধর্মভীরু ব্যক্তির সমপরিমাণ প্রতিদান দান করেন। অতঃপর আল্ল­াহ তা’আলা বলেন, “ওহে কামনা ত্যাগী ও আমার জন্য যৌবন উৎসর্গকারী যুবক! তুমি আমার নিকট আমার কোন কোন ফেরেশতার ন্যায় মর্যাদাশীল।” হযরত হুসাইন ইবনে সুফিয়ান আলোচ্য হাদীসখানা শুরাইহ (রা)/(রঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন।
[মহান আল্র­াহর জন্য প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভালবাসার ভেতর দিয়ে প্রেমিক যুবক ফেরেশতার মর্যাদা অর্জন করতে পারে। অতএব, আল্ল­াহর উদ্দেশ্যে নিজের প্রেম ও ভালবাসা নিয়োজিত করা প্রত্যেক যুবকের জন্য আবশ্যক।]

আল্লাহর উদ্দেশ্যে অপরকে ভালবাসা ও ঘৃণা করা সম্পর্কিত হাদীসে কুদসীসমূহ (বাংলা অর্থ)

মহাগ্রন্থ আল কোরআন তিলাওয়াতের মূল্য ও মর্যাদা বর্ণনাতীত। নিরাকার স্রষ্টার সাথে সাকার বান্দার সরাসরি সম্পর্ক স্থাপনের সর্বোত্তম সূত্র কোরআন তিলাওয়াত। কোরআনুল কারীম আল্ল­াহর বাণী এবং তাঁর সত্ত্বা থেকে নিঃসৃত। অতএব এটা মুখে আবৃত্তি করাই তাঁকে কার্যকরীভাবে স্মরণ করার প্রথম সোপান। তারপর কোরআনের আদেশ-নিষেধ ও সারগর্ভ উপদেশমালা সম্যক আয়ত্ব করা এবং তদানুযায়ী জীবন গঠনে মনোযোগী হওয়াই কোরআনুল কারীম তিলাওয়াতের উদেশ্য। বস্তুত কোরআন তিলাওয়াতই শুধুমাত্র আল­াহ ও তাঁর অনুগত বান্দার মধ্যে সংযোগ স্থাপনের শ্রেষ্ঠতম পন্থা। এ জন্য রসূলে মাকবুল সাল্ল­াল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্ল­াম কোরআন তিলাওয়াতের ওপর অত্যাধিক গুরুত্ব প্রদান করেছেন।
নিয়মিত বৃষ্টিপাতের সাহায্যে জমিকে যেরুপ বীজ বপনের উপযুক্ত করা যায়, অনুরূপভাবে নিয়মিত কোরআন তিলাওয়াতের দ্বারা মানবরূপ জমিকে ঈমানের বীজ বপনের যোগ্য করে তোলা সম্ভব। এর দুর্নিবার আকর্ষণ ধরাপৃষ্ঠে অবস্থিত কোররআন তিলাওয়াতকারীর আন্তরিক সত্ত্বাকে আল্ল­াহর সুউচ্চ আরশ পর্যন্ত নিয়ে যায়। কোরআনুল কারীম তিলাওয়াতের এরূপ শক্তি আছে বলেই রসূলে মাকবুল সাল্ল­াল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্ল­াম অসংখ্য হাদীসে এর গুরুত্ব বর্ণনা করেছেন এবং পাশাপাশি আবৃত্তিকারীর মর্যাদা প্রসঙ্গেও উল্লে­খ করেছেন। তিনি বলেছেন, “কোরআন তিলাওয়াতের মজলিসে ভোরের বেলা ফেরেশতাগণ উপস্থিত হন।” তা ছাড়া রোজ-কিয়ামতে হাফিযে কুরআন ও কোরআন স্বয়ং তিলাওয়াতকারীর স্বপক্ষে আল্ল­াহর দরবারে সুপারিশ করবেন। মহাগ্রন্থ আল কোরআনের প্রত্যেকটি অক্ষর তিলাওয়াতের পরিবর্তে দশটি নেকী লাভ হয়, এ উক্তির তাৎপর্য হলো, প্রত্যেক আবৃত্তিকারী মনোযোগ সহকারে তিলাওয়াত করে উহার প্রত্যেকটি বিষয় বুঝতে চেষ্টা করবে।

১. বরকতময় আল্ল­াহ তা’আলা বলেন, “কোরআন তিলাওয়াত ও আমার যিকিরের ফলে যে ব্যক্তি আমার নিকট কিছু প্রার্থনা করার সুযোগ পায় না, সে প্রার্থনাকারীকে আমি যা দিয়ে থাকি তা শ্রেষ্ঠতর দান। আর মহান আল্র­াহর বাণীর মর্যাদা যাবতীয় বাণীর ওপর ঠিক তেমনি, যেমন যাবতীয় সৃষ্টির ওপরে সুপ্রতিষ্ঠিত রয়েছে মহান আল্ল­াহর মর্যাদা।” দারামী আলোচ্য হাদীসখানা হযরত আবু সাঈদ (রা)-এর সূত্রে সংগ্রহ করেছেন।

২. মহান ও মর্যাদাবান আল্ল­াহ বলেছেন, “নমায আমার ও আমার বান্দার মধ্যে অর্ধেক অর্ধেক ভাগ করা হয়েছে। আমার বান্দা আমার নিকট থেকে যা চায় তা তার জন্য।” অতঃপর যখন কোন বান্দা বলে, “যাবতীয় প্রশংসা আল্ল­াহর জন্য যিনি বিশ্বজগতের প্রতিপালক”- তখন আল্ল­াহ বলেন, “আমার বান্দা আমার যথার্থ প্রশংসা করেছে।” অতঃপর যখন যে বলে, “তিনি করুণ্যময় ও দয়ালু।” তখন আল্ল­াহ বলেন, “আমার বান্দা আমার   স্তুতি বর্ণনা করেছে।” আর যখন সে বলে, “তিনি শেষ বিচারের দিনের অধিপতি।” তখন আল্ল­াহ বলেন, “আমার বান্দা আমার মর্যাদা প্রকাশ করেছে।” যখন যে বলে, “আমরা তোমারই ইবাদত করি এবং তোমারই নিকট সাহায্য কামনা করি।” তখন আল্ল­াহ বলেন, “এটা আমার ও আমার বান্দার মধ্যে আধা-আধি।” আমার বান্দা যা চায় তা তার জন্য। তারপর যখন সে বলে, আমাদের সহজ-সরল পথে চালাও তাদের পথে যাদের ওপর তুমি করুণা বর্ষণ করেছ, অভশপ্তদের পথে নয় এং পথভ্রষ্টদের পথেও নয়- তখন আল্ল­াহ বলেন, এটা আমার বান্দার অংশ। আর আমার বান্দা আমার নিকট যা চায় তা তার জন্য। ইমাম আহমদ ও ইমাম মুসলিম আলোচ্য হাদীসখানা হযরত আবু হুরায়রা (রা)-এর সূত্রে বর্ণনা করেছেন।

৩. তোমাদের প্রতিপালক বলেছেন, “হে বনী আদম, আমি তোমার ওপর সাতটি আয়াত অবতীর্ণ করেছি, তন্মধ্যে তিনটি আমার জন্য, তিনটি তোমার জন্য এবং একটি আমার ও তোমার মধ্যে অর্ধেক-অর্ধেক। অতঃপর যা আমার জন্য তা ‘ আলহামদু লিল্ল­াহি রাব্বিল আলামীন, আর রাহমানির রাহীম, মালিকি ইয়াওমিদদীন। আর যা আমার ও তোমার মধ্যে তা- ইয়্যাকা-না’বুদু ওয়াইয়্যাকা নাসতায়ীন। তোমার পক্ষ থেকে ইবাদত এবং আমার পক্ষ থেকে তোমাকে সাহায্য দান। আর যা তোমার জন্য তা ইহদিনাস সিরাত্বোল মুসতাকীম সিরাত্বোল্ল­­াযীনা আন আমতা আলাইহিম, গায়রিল মাগদুবি আলাইহিম ওলাদদ্বো—-য়াল্ল­ীন।”  তিবরানী আলোচ্য হাদীসখানা হযরত উবাই ইবনে কা’ব (রা)-এর সূত্রে বর্ণনা করেছেন।

৪. রাতের বেলা যে ব্যক্তি নিজ বিছানায় শয়নের ইচ্ছা করে তারপর ডান কাতে শয়ন করে একশতবার  সূরা এখলাস’ (কুলহু ওয়াল্লহু আহাদ) সূরা তিলাওয়াত করে শেষ বিচারের দিন সে ব্যক্তিকে আল্ল­াহ তা’আলা বলবেন, “হে আমার বান্দা! তুমি তোমার ডান দিক দিয়ে বেহেশতে প্রবেশ কর। ইমাম তিরমিযী আলোচ্য হাদীসখানা হযরত আনাস (রা)-এর সূত্রে নকল করেছেন।

 

কোরআন তিলাওযাত সম্পর্ক  হাদীসে কুদসীসমূহ (বাংলা অর্থ)

মূলতঃ আল্ল­াহর যমীনের সর্বত্রই মসজিদ। কিন্তু আলোচ্য অধ্যায়ে ইবাদতের উদ্দেশ্যে নির্মিত ঘরকেই মসজিদ বলা হয়েছে। মসজিদ আল্লাহর ঘর, মু’মিন বান্দা মাত্রই সে ঘর আবাদকারী ও আল্ল­াহর প্রতিবেশী। নামাযই একমাত্র ইবাদত, যার ভেতর দিয়ে আল্ল­াহ ও বান্দার মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক গড়ে উঠে। এ ইবাদত মর্যাদায় শ্রেষ্ঠতম এবং মানবাত্মার জন্য পরম কল্যাণকর। নামাযের নিয়মিত পদ্ধতির মাধ্যমে মহান স্রষ্টার নিকট মানুষের চরম বিনয়, নম্রতা ও আত্মসমর্পণের ভাব পরিপূর্ণরূপে প্রকাশ পায়। এ জন্যই ‘সালাত’ শব্দটি বিনয়, নম্রতা, দু’আর অর্থে ব্যবহৃত হয়। আল্ল­াহ তা’আলার অশেষ দয়া ও করুণা লাভের পক্ষে যাবতীয় ইবাদতের মধ্যে নামায সর্বাধিক কার্যকরী।
নামায আল্লাহর নিকট এত প্রিয় যে, ফরয নামায যথাসময়ে আদায়কারীকে বেহেশত দানে তিনি ওয়াদাবন্ধ। আর নফল নামাযও ফরযের পরিপূরক হিসেবে তার কাছে বেশি প্রিয়। নামায অতি গুরুত্বপূর্ণ ও আবশ্যকীয় ইবাদত। যথাসময়ে ফরয নামায আদায় করতে না পারলে তা কাযা করতে হয় কিন্তু হেলায় বাদ দেওয়া চলবে না। রাত্রি জাগরণ ও নফল নামাযের মাধ্যমে প্রার্থনা       করলে আল্ল­াহ তা’আলা তা কবুল করেন।  শেষ রাত্রি নফল নাময (তাহাজ্জুদ নামায) ও প্রার্থনার সর্বোত্তম সময়।
মসজিদ  নামায সম্পর্কিত হাদীসে কুদসীসমূহ 
১. তোমরা যখন কোন ব্যক্তিকে মসজিদ সমূহের বরাবর গমন করতে দেখ, তখন তাকে মু’মিন বলে সাক্ষ্য দিতে কৃপণতা প্রকাশ করো না। কারণ আল্ল­াহ তা’আলা বলেন, নিশ্চয়ই যে ব্যক্তি আল্ল­াহর ওপর ঈমান এনেছে যে আল্ল­াহর মসজিদ আবাদ করে। হাকেম আলোচ্য হাদীসখানা হযরত আবু সাঈদ (রা)-এর সূত্রে নকল করেছেন।

২. নিশ্চয়ই আল্ল­াহ তা’আলা শেষ বিচারের দিন উচ্চ আওয়াজে ডাকতে থাকবেন, “আমার প্রতিবেশী কোথায়” “আমার প্রতিবেশী কোথায়?” তখন ফেরেশতাগণ আরয করবে, “হে আমার প্রতিপালক আপনার প্রতিবেশী হওয়া কার পক্ষে সম্ভব?” জবাবে তিনি বলবেন,  “মসজিদসমূহ আবাদকারীগণ কোথায়?” ইবনুন-নাজ্জার আলোচ্য হাদীসখানা হযরত আনাস (রা)-এর সূত্র বর্ণনা করেছেন।

৩. কোন মুয়াযযিন যখন আযান দিতে শুরু করে, তখন আল্ল­াহ তা’আলা তার মাথার উপর তাঁর (কুদরতী) হাত রাখেন, তিনি হাত স্থির রাখেন, যে পর্যন্ত সে আযান থেকে অবসর গ্রহণ না করে। আর নিশ্চয়ই তিনি তার কন্ঠস্বর বিস্তারের দূরত্ব পর্যন্ত তাকে ক্ষমা করে দেন- তারপর যখন যে আযান শেষ করে অবসর গ্রহণ করে, তখন আল্ল­াহ তা’আলা বলেন, হে আমার বান্দা! তুমি সত্য বলেছ এবং তুমি সত্যের পক্ষে সাক্ষ্য দিয়েছ। সুতরাং তুমি শুভ সংবাদ গ্রহণ কর। হাকেম আলোচ্য হাদীসখানা হযরত আনাস (রা)-এর সূত্রে নকল করেছেন।

৪. তোমার প্রতিপালক যে বকরীর রাখালের প্রতি খুব সন্তুষ্ট, যে কোন পাহাড়ের চূড়ায় বকরী চরায়, নামাযের জন্য আযান দেয় এবং নামায আদায় করে। অতঃপর মহান ও মর্যাদাবান আল্ল­াহ বলেন, “তোমরা আমার এ বান্দার প্রতি লক্ষ্য কর, যে আযান দেয় নামায আদায় করে ও আমাকে ভয় করে। আমি আমার বান্দাকে ক্ষমা করে দিয়েছি এবং তাকে বেহেশতে প্রবেশের অধিকার দিলাম।” ইমাম আহমদ আলোচ্য হাদীসখানা উকবা ইবনে আমের (রা)-এর সূত্রে বর্ণনা করেছেন।

৫. মহান আল্ল­াহ তা’আলা বলেছেন, “(হে মুহাম্মদ)! আমি তোমার উম্মতের ওপর পাঁচ ওয়াক্ত নামায ফরয করেছি। আর আমি নিজেই এ প্রতিশ্র“তি দিয়েছি যে, যে ব্যক্তি এ পাঁচ ওয়াক্ত নামায যথাসময়ে যত্নসহকারে আদায় করবে, আমি তাকে বেহেশতে প্রবেশ করাব। আর যে ব্যক্তি তা হিফাযত করবে না, তার জন্য আমার কোন প্রতিশ্র“তি নেই।” ইবনু মাজাহ আলোচ্য হাদীসখানা হযরত আবু কাতাদা (রা)-এর সূত্রে বর্ণনা করেছেন।

৬. রসূলে মাকবুল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্ল­াম বলেন, মহান ও বরকতময় আল্ল­াহর নিকট থেকে হযরত জিবরাঈল (আঃ) আমার নিকট আগমন করলেন এবং বললেন, হে মুহাম্মদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্ল­াম ! মহান ও মর্যাদাবান আল্ল­াহ বলেন, “আমি নিশ্চয়ই তোমার উম্মতের ওপর পাঁচ ওয়াক্ত নামায ফরয করেছি। যে ব্যক্তি ঐগুলোর জন্য অযু সহকারে, নির্দিষ্ট সময়ে, তাদের রুকু ও সিজদা সহকারে সম্পূর্ণরূপে আদায় করে, নিশ্চয় তার জন্য আমার নিকট এগুলোর পরিবর্তে এ প্রতিশ্রুতি রয়েছে  যে, আমি তার বিনিময়ে তাকে বেহেশতে প্রবেশ করাব। আর যে ব্যক্তি তার ব্যতিক্রম করে সাক্ষাত করবে তার স্বপক্ষে আমার কোন অঙ্গীকার নেই। আমি ইচ্ছা করলে তাকে শাস্তি দিতে পারি, আর ইচ্ছা করলে তার প্রতি করুণাও করতে পারি।”
আলোচ্য হাদীসখানা হযরত আবূ দাউদ তায়ালিসী উবাদা ইবনে সামিত (রা)-এর সূত্রে বর্ণনা করেছেন।

৭. শেষ বিচার দিবসে বান্দার নিকট থেকে সর্বপ্রথম যে বিষয়ে হিসাব নেয়া হবে তা হলো তার নামায। যদি সে তা পূর্ণ মাত্রায় আদায় করে থাকে তবে তাকে পূর্ণ লেখা হবে। আর যদি সে তা পূর্ণ না করে থাকে, তাহলে মহান ও মর্যাদাবান আল্ল­াহ ফেরেশতাগণকে বলবেন, দেখ, আমার বান্দার কোন নফল নামায আছে কিনা, যা দ্বারা তোমরা তার ফরয পূর্ণ করে নিতে পার। অতঃপর যাকাত বিষয়ে অনুরূপভাবে হিসাব নেয়া হবে। অতঃপর তার সমুদয় আমলের হিসাব অনুরূপভাবে নেয়া হবে। ইমাম আহমদ ও আবূ দাঊদ আলোচ্য হাদীসখানা হযরত তামীমদারী ও ইবনে আমি শায়বা (রা)-এর সূত্রে বর্ণনা করেছেন।
[আলোচ্য হাদীস স্পষ্ট প্রমাণ করে যে শেষ বিচারের দিবসে নফল নামায আল্ল­াহর দরবারে ফরযের অন্তর্ভূক্ত হবে।]

৮. নিশ্চয়ই যখন কোন বান্দা নামাযে দন্ডায়তমান হয় তখন সে করুণাময় আল্ল­াহর (কুদরতী) চোখের সামনে অবস্থান করে। অতঃপর যখন যে এদিক-সেদিক তাকায় তখন  আল্ল­াহ তাকে বলেন, “হে বনী আদম! তুমি কার প্রতি দৃষ্টিপাত কর? তোমার জন্য সে কি আমার চেয়ে শ্রেষ্ঠতর? হে বনী আদম! তুমি তোমার নামাযে লিপ্ত হও, কারণ তুমি যার দিকে দৃষ্টিপাত করতে উদ্যত, আমি তোমার জন্য তার চেয়ে উত্তম।” উকইলী আলোচ্য হাদীসখানা হযরত আবু হুরায়রা (রা)-এর সূত্রে বর্ণনা করেছেন।

৯. মহান ও মর্যাদাবান  আল্ল­াহ বলেছেন, “আমার কোন বান্দা আমার নিকট প্রিয় হয় না অন্য কোন প্রিয়বস্তু দ্বারা, যতক্ষণ সে আমি তার ওপর ফরয করেছি, তা সমাধা না করে।” খাতীব আলোচ্য হাদীসখানা হযরত আলী (রা)-এর সূত্রে বর্ণনা করেছেন।

১০. মহান ও বরকতময় আমার প্রতিপালক, সে রাত্রে তাঁর শ্রেষ্ঠতম আকৃতিতে আমার নিকট আগমন করলেন। তিন স্বপ্নে বললেন, “হে মুহাম্মদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্ল­াম! আপনি কি জানেন উর্ধ্বতম জগতের ফেরেশতা প্রধানগণ কি বিষয়ে ঝগড়া করতেছে?” আমি বললাম, ‘না’। অতঃপর তিনি আমার দুই কাঁধের মাঝখানে তাঁর হাত রাখলেন। এমনকি এর শীতলতা আমি আমার বুকের (উভয় স্তনের) মাঝখানে অনুভব করলাম। তারপর আকাশের যাবতীয় বস্তু চিনলাম, তারপর তিনি (পুনরায়) জিজ্ঞাসা করলেন, “হে মুহাম্মদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্ল­াম! আপনি কি জানেন উর্ধ্বতম জগতের ফেরেশতা প্রধানগণ কি ব্যাপারে ঝগড়া করতেছে?” জবাবে আমি বললাম, “হ্যাঁ, পাপ মোচনকারী ও পদমর্যাদা বর্ধনকারী আমলের বিষয়ে। পাপ মোচনকারী আমল হলো নামায আদায়ের পর মসজিদে বসে অপেক্ষা করা, জামায়াতে যোগ দেওয়ার জন্য পদব্রজে হেঁটে যাওয়া, কষ্ট হওয়া সত্তে¡ও ভালভাবে ওযু করা।” আল্ল­াহ বললেন, “হে মুহাম্মদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্ল­াম! আপনি সত্য বলেছেন। যে ব্যক্তি এসব করে সে কল্যাণের সাথে জীবন যাপন করে এবং কল্যাণের সাথে মৃত্যুবরণ করে। আর তার কৃত পাপ থেকে পবিত্র হয়ে যায় সে দিনের মত, যেদিন তার মাতা তাকে প্রসব করেছেন।” আর তিনি বললেন,  “হে মুহাম্মদ! যখন আপনি নামায আদায় করেন তখন বলেন, হে আল্ল­াহ! আমি আপনার নিকটি থেকে ভাল কাজ সম্পন্ন করার তৌফিক, মন্দ কাজ ত্যাগ করার শক্তি ও মিসকীনদের প্রতি ভালবাসা প্রার্থনা করি। আর পাশাপাশি কামনা করি আপনি আমাকে ক্ষমা করেন এবং আমার প্রতি দয়া প্রদর্শন করুন, আমার তওবা গ্রহণ করুন। সে সাথে আরও বলুন, (হে প্রভু!) যখন আপনি আপনার বান্দাগণকে পরীক্ষা করতে চান, তখন আমাকে অপরীক্ষিত অবস্থায় আপনার নিকট গ্রহণ করে নেন (মৃত্যু দিন)।” তিনি আরও বলেছেন, পদমর্যাদা বর্ধনকারী কাজ হলো প্রকাশ্যভাবে সালাম করা, ক্ষুধার্তকে আহার্য দান করা এবং রাত্রে যখন মানুষ ঘুমিয়ে থাকে তখন নামায আদায় করা।
আবদুর রাযযাক ও আহমদ আলোচ্য হাদীসখানা হযরত আব্দুল­াহ ইবনে আব্বাস (রা)-এর সূত্রে বর্ণনা করেছেন।

১১. মহান আল্ল­াহ তা’আলা বলেছেন, “হে আদম সন্তান! দিনের প্রথমাংশে চার রাকাত নামায আদায়ে অক্ষম হইও না, এর শেষে আমি তোমাকে যথেষ্ট সাহায্য করব।”  তিবরানী আলোচ্য হাদীসখানা হযরত আবুদ দারদা (রা)-এর সূত্রে নকল করেছেন।

১২. আমাদের প্রতিপালক দুই ব্যক্তির ওপর অত্যন্ত সন্তুষ্ট হয়েছেন, তাদের এক ব্যক্তি, যে রাত্রে তার পছন্দনীয় স্ত্রী, শিশু এবং নরম বিছানা ও লেপ ছেড়ে আমার নামাযের জন্য উঠে আসে। অতঃপর আল্লাহ তা’আলা তাঁর ফেরেশতাগণকে ডেকে বলেন, “তোমরা লক্ষ্য কর, যে তার স্ত্রী-পরিজন ছেড়ে, কোমল বিছানা ও লেপ থেকে নামাযের জন্য উঠে এসেছে শুধুমাত্র আমার নিকট যে প্রতিদান রয়েছে তার জন্য আগ্রহান্বিত হয়ে এবং আমার নিকট যে শাস্তি রয়েছে তার ভয়ে।” দ্বিতীয় ব্যক্তি সেই, যে আল্ল­াহর পথে জিহাদ করেছে, তারপর পরাস্ত হয়ে পলায়ন করেছে। অতঃপর পলায়ন করার শাস্তি বুঝতে পেরেছে। তারপরও পুনরায় যুদ্ধে ফিরে এসেছে এমনকি শত্রু কর্তৃক তার রক্ত ক্ষরিত হয়েছে। তখন আল্ল­াহ তাঁর ফেরেশতাগণকে বলেন, “তোমরা আমার এ বান্দার প্রতি লক্ষ্য কর, সে আমার নিকট যে প্রতিদান রয়েছে তার আগ্রহে এবং আমার নিকট যে শাস্তি রয়েছে তার ভয়ে পুনরায় যুদ্ধে ফিরে এসেছে। এমনকি তার রক্ত ক্ষরিত হয়েছে।” ইমাম আহমদ আলোচ্য হাদীসখানা হযরত আব্দুল­াহ ইবনে মাসউদ (রা)-এর সুত্রে বর্ণনা করেছেন।

১৩. মহান আল্ল­াহ তা’আলা বলেছেন, তিনটি বস্তু আছে যে ব্যক্তি এর সংরক্ষণ করে সে আমার প্রকৃত বন্ধু। আর যে ঐগুলো নষ্ট করে সে আমার শত্র“। তিনটি বস্তু হলো- নামায, সাওম ও স্ত্রী সহবাসের পর গোসল। ইবনুন নাজ্জার আলোচ্য হাদীসখানা হযরত আনাস (রা)-এর সূত্রে নকল করেছেন।

১৪. মহান আল্ল­াহ তা’আলা বলেন, “নিশ্চয়ই আমি সে ব্যক্তির নামায গ্রহণ করি, যে আমার মহত্তে¡র নিকট বিনয়ে নত হয়, আর আমার সৃষ্টির নিকট গর্ব করে বেড়ায় না, আমার স্মরণে দিনাতিপাত করে এবং নিজের অপরাধে অবিরত বাড়াবাড়ি করে রাত্রি যাপন করে না। সে ক্ষুধার্তকে খাবার দান করে, অতিথিকে আশ্রয় দান করে, ছোটকে আদর করে এবং বড়কে সম্মান করে। অতঃপর এই সে ব্যক্তি, যে আমার নিকট কোন কিছু চাইলে আমি তাকে দান করি, আর আমার নিকট দু’’আ করলে আমি তার দু’’আ কবুল করি। আর সে আমার নিকট কাকুতি-মিনতি করলে আমি তার প্রতি করুণা বর্ষণ করি। তার দৃষ্টান্ত আমার নিকট জান্নাতসমূহের মধ্যে ফিরদাউসের অনুরূপ, যার ফলসমূহ পচে বিনষ্ট হয় না এবং যার অবস্থা অপরিবর্তিত থাকে।” ইমাম দারু কুতনী আলোচ্য হাদীসখানা হযরত আলী (রা)-এর সূত্রে বর্ণনা করেছেন।

১৫. তোমাদের ওপর কতিপয় গিরা বা বাঁধ রয়েছে, অতঃপর যখন কেহ অযুতে তার হাত ধৌত করে তখন একটি গিরা খুলে যায়, আর যখন সে তার মুখ ধৌত করে, তখন একটি গিরা খুলে যায়, আর যখন সে তার উভয় পা ধৌত করে তখন একটি গিরা খুলে যায়। অতঃপর আল্ল­াহ তা’আলা আড়াল থেকে বলেন, “আমার এ বান্দার প্রতি তোমরা লক্ষ্য কর, সে তার নিজের আত্মার চিকিৎসা করতেছে, সে যা ইচ্ছা তাই আমার নিকট চাইতে পারে। আমার বান্দা যা কিছু আমার নিকট প্রার্থনা করে তাই তার জন্য রয়েছে।” তিবরানী আলোচ্য হাদীসখানা হযরত উকবা ইবনে আমের (রা)-এর সূত্রে বর্ণনা করেছেন।

১৬. রক্ষণাবেক্ষণকারী ফেরেশতাদ্বয় কোন ব্যক্তির নামাযের সাথে যুক্ত নামায আল্ল­াহর নিকট উঠিয়ে নিয়ে যায় না, বরং মহান আল্ল­াহ বলেন, “আমি তোমাদেরকে সাক্ষ্য রাখতেছি যে, আমি আমার বান্দার উভয় নামাযের মধ্যবর্তী পাপ ক্ষমা করে দিয়েছি।” ইমাম বায়হাকী আলোচ্য হাদীসখানা হযরত আনাস (রা)-এর সূত্রে বর্ণনা করেছেন।
[নামাযের সাথে নামাযের যুক্ত করার অর্থ, এক ওয়াক্ত নামায আদায় করে অন্য ওয়াক্তের অপেক্ষায় থাকা এবং সময় আসলেই তা আদায় করা।]

১৭. যে ব্যক্তি নামাযের কথা ভুলে যায়, তার কর্তব্য হলো- যখন সে তা স্মরণ করবে তখনই তা আদায় করবে। কারণ মহান আল্ল­াহ বলেছেন, “আমার স্মরণের উদ্দেশ্যে নামায প্রতিষ্ঠা কর।” ইমাম মুসলিম আলোচ্য হাদীসখানা হযরত আবূ হুরায়রা (রা)-এর সূত্রে বর্ণনা করেছেন।

১৮. যখন রাতের এক-তৃতীয়াংশ বাকী থাকে, তখন আল্ল­াহ তা’আলা দুনিয়ার নিকটতম আকাশে নেমে আসেন এবং বলেন, “কে আছে, যে আমার নিকট দু’আ করে যেন আমি তার দু’আ কবুল করতে পারি? কে আছে, যে আমার নিকট ক্ষমা চায় যেন আমি তাকে ক্ষমা করতে পারি? কে আছে, যে আমার নিকট বিপদ দূর করবার জন্য প্রার্থনা করে, যেন আমি তার বিপদ দূর করতে পারি? কে আছে  ?” (আল­াহ এরূপ বলতে থাকেন) যে পর্যন্ত না সকাল হয়। ইবনুন নাজ্জার আলোচ্য হাদীসখানা হযরত আবূ হুরায়রা (রা)-এর সূত্রে বর্ণনা করেছেন।

১৯. যখন রাতের এক-তৃতীয়াংশ বাকী থাকে, তখন বরকতময় আল্ল­াহ তা’আলা বলেন, “কে সে ব্যক্তি, যে বিপদ দূরীকরণ আশা করে যেন আমি তার বিপদ দূর করতে পারি? কে সেই ব্যক্তি, যে আমার নিকট রিযিক চায় যেন আমি তাকে রিযিক দিতে পারি? কে সে ব্যক্তি, যে আমার নিকট চায় যেন আমি তাকে দিতে পারি।” হযরত আবূ দাউদ আলোচ্য হাদীসখানা হযরত আবূ হুরায়রা (রা)-এর সূত্রে বর্ণনা করেছেন।

২০. রসূলে মাকবুল সাল্ল­াল্ল­াহু আলাইহি ওয়া সাল্ল­াম বলেন, যদি আমি এটা আমার উম্মতের জন্য কষ্টকর মনে না করতাম তবে নিশ্চয়ই আমি ইশার নামায রাতের এক-তৃতীয়াংশ অথবা অর্ধেকের পরে সরিয়ে দিতাম। কারণ, যখন রাত্রির অর্ধেক সময় অতিক্রান্ত হয়, তখন আল্ল­াহ তা’আলা দুনিয়ার নিকটতম আকাশে নেমে আসেন এবং বলেন,“কোন ক্ষমা প্রার্থনাকারী আছে কি, যেন আমি তাকে ক্ষমা করে দিতে পারি? কোন তওবাকারী আছে কি, যেন আমি তার তওবা কবুল করতে পারি? কোন প্রার্থনাকারী আছে কি, যেন আমি তার প্রার্থনা কবুল করতে পারি?” যে পর্যন্ত না ফজরের উদয় হয় (ততক্ষণ এরূপ আহবান চলতে থাকে) ইমাম আহমদ আলোচ্য হাদীসখানা হযরত আবূ হুরায়রা (রা)-এর সূত্রে বর্ণনা করেছেন।

২১. মহান ও বরকতময় আমাদের প্রতিপালক (আল্ল­াহ) প্রতি রাত্রে নিকটতম আকাশে অবতরণ করেন। কারণ যখন রাত্রির এক-তৃতীয়াংশ বাকী থাকে, তখন তিনি বলেন, “কে আমাকে ডাকবে, যেন আমি তার ডাকে সাড়া দিতে পানি? কে আমার নিকট চাবে, যেন আমি তাকে প্রার্থিত বস্তু দিতে পারি? কে আমার নিকট ক্ষমা ভিক্ষা করবে, যেন আমি তাকে ক্ষমা করতে পারি?” ইমাম মালিক ও শায়খাইন আলোচ্য হাদীসখানা হযরত আবূ হুরায়রা (রা)-এর সূত্রে বর্ণনা করেছেন।

২২. তোমরা কি জান তোমার প্রভু কি বলেন, তিনি বলেন, যে ব্যক্তি নফল নামায এর নির্ধারিত সময়ে আদায় করে, এর সংরক্ষণ করে, আর এর দায়িত্ব অগ্রাহ্য করে নষ্ট করে না, তার স্বপক্ষে আমার ওপর দায়িত্ব কর্তব্য এই যে, আমি তাকে বেহেশতে প্রবেশ করাব। আর যে ব্যক্তি এ সকল নামায এগুলোর সময়মত আদায় করে না, তাদের সংরক্ষণ করে না, আর তাদের হক উপেক্ষা করে তা নষ্ট করে দেয়, তার অনুকূলে আমার কোন অঙ্গীকার নেই। যদি আমি ইচ্ছা করি তাকে শাস্তি দিতে পারি, আর যদি ইচ্ছা করি তাকে ক্ষমা করে দিতে পারি। তাবরাণী আলোচ্য হাদীসখানা হযরত কা’ব ইবনে উজরা (রা)-এর সূত্রে বর্ণনা করেছেন।

২৩. হিফাযতকারী ফেরেশতাদ্বয়ের মধ্যে এমন কেহ নেই, যে আল্ল­াহর নিকট যত্নসহকারে যা রেখেছে, তা উঠায়ে নিয়ে যায়, তারপর তার প্রথম পৃষ্ঠায় লিখিত সাওয়াব দেখে এবং শেষের পৃষ্ঠায় লিখিত সাওয়াব দেখে এবং আল্ল­াহ তা’আলা ফেরেশতাগণকে বলেন, “তোমরা সাক্ষী থাক। আমি আমার বান্দাকে উভয় পৃষ্ঠার মধ্যবর্তী যারা কিছু ত্রুটি রয়েছে, সব ক্ষমা করে দিয়েছি।” আবূ ইয়ালা আলোচ্য হাদীসখানা হযরত আনাস (রা)-এর সূত্রে বর্ণনা করেছেন।

 

 

মসজিদ আযান ও নামায সম্পর্কিত হাদীসে কুদসীসমূহ (বাংলা অর্থ)