অনলাইন সীমান্তবাণী ডেস্ক : ঋণের বোঝা আর জীবিকার তাগিদে কঠোর পরিশ্রম করতে গিয়ে চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন ভারতের আখ কাটা নারী শ্রমিকরা। মাসিকের যন্ত্রণা, গর্ভাবস্থা ও শারীরিক অসুস্থতার মধ্যেও কাজ চালিয়ে যেতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। একদিন কাজ বন্ধ রাখলেও মজুরি কাটা ও জরিমানার আশঙ্কায় অনেকে জরায়ু অপসারণের মতো বড় অস্ত্রোপচারের কথা ভাবছেন।
বৃহস্পতিবার (২৩ অক্টোবর) ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য ইনডিপেনডেন্টের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছে দৈনিক ইত্তেফাক।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতে আনুমানিক ১৫ লাখ মানুষ আখ কাটার কাজে নিয়োজিত। তাদের অনেকে প্রতিদিন প্রায় ১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করে দৈনিক প্রায় ৪০০ রুপি মজুরি পান। স্বামী-স্ত্রী মিলে দলবদ্ধভাবে কাজ করা এসব শ্রমিকের বড় একটি অংশ মহারাষ্ট্রের বিদ জেলা থেকে জীবিকার সন্ধানে বিভিন্ন এলাকায় যান।
কাজের জন্য তাদের অস্থায়ী তাঁবুতে থাকতে হয়। অনেক শিবিরে শৌচাগার ও সুপেয় পানির পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। মাসিকের সময় কিংবা অসুস্থ অবস্থায়ও কাজে বিরতি নেওয়ার সুযোগ সীমিত। একদিন কাজ করতে না পারলে মজুরি হারানোর পাশাপাশি ঠিকাদারের কাছে ঋণ পরিশোধ ও অতিরিক্ত অর্থ দেওয়ার চাপও তৈরি হয়।
ঋণের বোঝায় জর্জরিত নারী শ্রমিকরা
আখ কাটার কাজ মৌসুমি হওয়ায় শ্রমিকদের অনেকেই কাজ শুরুর আগে ঠিকাদারের কাছ থেকে অগ্রিম অর্থ নেন। স্থানীয়ভাবে এই অগ্রিম অর্থকে দাদন বলা হয়। পরে সেই অর্থ পরিশোধের জন্য নির্ধারিত সময়জুড়ে কঠোর পরিশ্রম করতে হয় তাদের।
প্রতিবেদনে পূর্ণিমা নামের এক নারী শ্রমিকের অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে অসহ্য শারীরিক যন্ত্রণা সহ্য করেও কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। তার ভাষ্য, ভারী আখ তোলা ও বহন করার কারণে কষ্ট বাড়ছে। কিন্তু কাজ বন্ধ করলে পরিবারের ভরণপোষণ ও ঋণ পরিশোধ করা কঠিন হয়ে পড়বে।
পূর্ণিমা জানান, তিন বছর ধরে যন্ত্রণা সহ্য করার পর তিনি জরায়ু অপসারণের কথা ভাবছেন। তবে অস্ত্রোপচারের খরচ জোগাড় করতেও তাকে নতুন করে ঋণ নিতে হতে পারে।
অস্ত্রোপচারের পরও কমেনি যন্ত্রণা
প্রতিবেদনে সবিতা নামের আরেক নারী শ্রমিকের দুর্ভোগের কথা উঠে এসেছে। ২০২৫ সালের মার্চে তিনি জরায়ু অপসারণের অস্ত্রোপচার করান। কিন্তু অস্ত্রোপচারের কয়েক মাস পরও তার রক্তপাত ও পেটের ব্যথা অব্যাহত থাকে।
পরে পুনেতে চিকিৎসা নিতে গেলে চিকিৎসকেরা তার শরীরে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে বলে জানান। অস্ত্রোপচারের আগের চিকিৎসা-সংক্রান্ত প্রতিবেদন চাইলে সেগুলোও তিনি পাননি বলে অভিযোগ করেন।
সবিতার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অস্ত্রোপচারের আগে সম্ভাব্য জটিলতা সম্পর্কে যথাযথভাবে না জানানো এবং পরবর্তী চিকিৎসাসেবার ঘাটতি নারী শ্রমিকদের দুর্ভোগ আরও বাড়িয়ে তুলছে।
জরায়ু অপসারণের উচ্চ হার
২০১৯ সালে মহারাষ্ট্র সরকার বিদ জেলার আখ কাটা কাজে যুক্ত ৮২ হাজার ৩০৯ জন নারী শ্রমিকের ওপর জরিপ চালায়। জরিপে দেখা যায়, তাদের মধ্যে ১৩ হাজার ৮৬১ জনের জরায়ু অপসারণ করা হয়েছে। অস্ত্রোপচার করা নারীদের ৪৫ শতাংশের বেশি পরবর্তী সময়ে শারীরিক কিংবা মানসিক বিভিন্ন সমস্যা ও যন্ত্রণার কথা জানিয়েছেন।
নারী অধিকারকর্মীদের অভিযোগ, কিছু ক্ষেত্রে যথাযথ চিকিৎসাগত প্রয়োজন ছাড়াই নারীদের জরায়ু অপসারণের অস্ত্রোপচারের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়। সরকারি হাসপাতালে স্বল্প খরচে চিকিৎসার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও অনেকে বেসরকারি চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানে যেতে বাধ্য হন বলে দাবি তাদের।
তবে অস্ত্রোপচারের জন্য রোগী পাঠানোর বিনিময়ে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সংশ্লিষ্ট কয়েকজন স্বাস্থ্যকর্মী।
সরকারি উদ্যোগেও বদলায়নি পরিস্থিতি
নারী শ্রমিকদের স্বাস্থ্যসেবা, কল্যাণমূলক সুবিধা ও কাজের পরিবেশ উন্নয়নে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হলেও মাঠপর্যায়ে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়নি বলে জানিয়েছেন শ্রমিকরা।
২০২৫ সালের মার্চে বোম্বে হাইকোর্ট আঞ্চলিক সরকারকে শ্রমিকদের নিবন্ধন, কল্যাণমূলক সুবিধা ও উন্নত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার বিষয়ে একাধিক নির্দেশ দেন। তবে এসব নির্দেশ বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়ে শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে।
ঠিকাদারদের দাবি, শ্রমিকদের মজুরি নির্ভর করে কারখানায় সরবরাহ করা আখের পরিমাণের ওপর। অসুস্থতার কারণে কেউ কাজ করতে না পারলে উৎপাদন কমে যায়। ফলে শ্রমিকদের বেতনসহ ছুটির ব্যবস্থা করা হয় না বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
অন্যদিকে কোকা-কোলা জানিয়েছে, একটি আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে শ্রমিকদের সুপেয় পানি, শৌচাগার, বিশ্রামের জায়গা, উপযুক্ত যন্ত্রপাতি ও নারী স্বাস্থ্যসামগ্রী সরবরাহে কাজ করছে তারা। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, এ উদ্যোগে ইতোমধ্যে এক লাখ মানুষ উপকৃত হয়েছেন। পেপসিকোর পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
জীবিকা নির্বাহ, ঋণ পরিশোধ ও শারীরিক যন্ত্রণার মধ্যে আটকে পড়া এসব নারী শ্রমিকের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ, নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা এবং শ্রমিক অধিকার নিশ্চিত করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।