অনলাইন সীমান্তবাণী ডেস্ক : কুষ্টিয়ায় গড়াই নদে নিজের মাত্র চার মাস বয়সী অবুঝ শিশুসন্তানকে ফেলে দিয়ে এক মায়ের নিজেও নদীতে ঝাঁপ দেওয়ার এক চাঞ্চল্যকর ও হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটেছে। ঘটনার পরপরই নদে মাছ ধরায় নিয়োজিত স্থানীয় জেলেরা দ্রুত উদ্ধার তৎপরতা চালিয়ে যমুনা (২২) নামের ওই নারীকে জীবিত উদ্ধার করতে সক্ষম হলেও, চার মাসের শিশু হাদিকে এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
শুক্রবার বিকেল চারটার দিকে কুষ্টিয়া শহর-সংলগ্ন কুষ্টিয়া-হরিপুর সংযোগ সেতু এলাকায় এই মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটে। ঘটনার পর থেকে স্থানীয় বাসিন্দাদের সক্রিয় সহযোগিতায় ফায়ার সার্ভিসের একটি বিশেষ টিম নিখোঁজ শিশুটিকে উদ্ধারে নদে তল্লাশি অভিযান অব্যাহত রেখেছে। এদিকে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি ও নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনা করে ওই শিশুর মাকে বর্তমানে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, প্রায় দুই বছর আগে কুষ্টিয়া সদর উপজেলার হাটশ হরিপুর এলাকার বাসিন্দা আবদুল আলিমের সঙ্গে যমুনার পারিবারিকভাবে ধুমধাম করে বিয়ে হয়। তবে বিয়ের পর থেকেই স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে প্রতিনিয়ত পারিবারিক কলহ ও মানসিক দূরত্ব চলছিল। এই কলহের জের ধরে মাত্র দুই দিন আগে যমুনা তার চার মাসের কন্যাসন্তান বা ছেলেকে নিয়ে কুমারখালী উপজেলার সুলতানপুর বেলতলা গ্রামে নিজের বাবার বাড়িতে বেড়াতে যান। এরপর শুক্রবার বিকেলে বাবার বাড়ি থেকে এসে হরিপুর সংযোগ সেতুর ওপর থেকে হঠাৎ করেই নিজের সন্তানকে নিচে চলন্ত নদীতে ফেলে দেন এবং মুহূর্তের মধ্যে নিজেও নদের পানিতে ঝাঁপ দেন।
কুষ্টিয়ার ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সিনিয়র স্টেশন অফিসার আরদেশ আলী ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, নদীতে ঝাঁপ দেওয়ার পরপরই কাছাকাছি থাকা মাছ ধরা নৌকার মাঝিরা তৎপরতা চালিয়ে ওই নারীকে তাৎক্ষণিক উদ্ধার করেন। তবে শিশুটি পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় তাকে পাওয়া যায়নি। বর্তমানে স্থানীয় অভিজ্ঞ ডুবুরি টিমের সহযোগিতায় নিখোঁজ শিশু হাদিকে উদ্ধারে গড়াই নদে ব্যাপক অভিযান চালানো হচ্ছে। উদ্ধার কাজে গতি আনতে এবং পেশাদার সহায়তার জন্য ফায়ার সার্ভিসের বিশেষজ্ঞ ডুবুরি দলকে খুলনা থেকে তলব করা হয়েছে, যারা ইতিমধ্যে কুষ্টিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছেন।
ভুক্তভোগী বাবা আবদুল আলিম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, তাদের চার মাসের সন্তানটি বেশ কিছুদিন ধরে অসুস্থ ছিল। উন্নত চিকিৎসার জন্য কুষ্টিয়ার বাইরে অন্য কোনো বড় শহরে যাওয়ার কথাও চূড়ান্ত হয়েছিল। এরই ধারাবাহিকতায় তিনি গতকাল ফোনে তার স্ত্রী যমুনাকে বাবার বাড়ি থেকে নিজেদের বাড়িতে ফিরে আসতে বলেছিলেন। কিন্তু যমুনা তার কথায় সাড়া দিয়ে বাড়িতে ফিরে আসেননি। এরপর বিকেলে হঠাৎ করেই লোকমুখে জানতে পারেন যে, নিজের ছেলেকে নদীতে ফেলে দিয়ে তার স্ত্রী নিজেও নদে ঝাঁপ দিয়েছেন। কেন এমনটা ঘটল, তা তিনি বুঝে উঠতে পারছেন না।
কুষ্টিয়া মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কবির হোসেন মাতুব্বর সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে জানান, মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ওই নারীর নিরাপত্তার স্বার্থে এবং ঘটনার সঠিক তদন্তের জন্য তাকে পুলিশ হেফাজতে রাখা হয়েছে। থানায় এনে তাকে ঘটনার কারণ সম্পর্কে বিস্তারিত জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তবে ওই নারী মানসিকভাবে প্রচণ্ড ভেঙে পড়ায় পুলিশের কোনো প্রশ্নেরই উত্তর দিচ্ছেন না; থানা হাজতে বসে তিনি কেবল অঝোরে কেঁদে চলেছেন। নদে নিখোঁজ হওয়া চার মাসের শিশুটিকে জীবিত অথবা মৃত অবস্থায় উদ্ধারের জন্য ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয়দের যৌথ অভিযান জোরদার করা হয়েছে বলেও জানান এই পুলিশ কর্মকর্তা।