September 6, 2026, 7:59 pm
শিরোনামঃ
দূষণমুক্ত নদী রেখে যেতে সবাইকে দায়িত্বশীল হতে হবে : প্রধানমন্ত্রী রোহিঙ্গা সংকট আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হাজার হাজার লিটার তেল পুড়িয়ে বিরোধী দলের লংমার্চ অযৌক্তিক : পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী চলতি মাসের মধ্যেই ইউপি নির্বাচনের তফসিল দেওয়া হবে : ইসি আনোয়ারুল চাঁপাইনবাবগঞ্জে স্কুল ফিডিংয়ের খাবার খেয়ে অসুস্থ ১৫ শিক্ষার্থী নোয়াখালীতে পুলিশ দেখে দৌড়ে পালানোর সময় আসামির মৃত্যু পুতিনের সঙ্গে ট্রাম্পের জামাতা ও দূতের বৈঠক ভারতে সার্কিট হাউসে নামাজ পড়ায় নেতার বিরুদ্ধে মামলা মার্কিন চাপে নতি স্বীকার করা হবে না : ইরানের প্রেসিডেন্ট যশোরে অ্যাম্বুলেন্সে পুত্রসন্তানের জন্ম দিলেন হাজতি নারী
এইমাত্রপাওয়াঃ

মালয়েশিয়া পাঠানোর নামে নারায়ণগঞ্জের ১৯ জনকে মিয়ানমারে নিয়ে মুক্তিপণ দাবি ; ৩ জন আটক

অনলাইন সীমান্তবাণী ডেস্ক : নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে পারিবারিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান মা সাইন প্রিন্টিং প্রেসে বড় ভাই আবুল কালাম আজাদের সঙ্গে কাজ করতেন জহিরুল ইসলাম (৩৮)। গত মার্চে দোকানের পাশ থেকে নিখোঁজ হন তিনি। এক মাস পর পরিবার জানতে পারে জহিরুল মিয়ানমারে বন্দি। তাকে মালয়েশিয়ায় পাচার করা হবে। মুক্তিপণ হিসেবে চাওয়া হয় ছয় লাখ টাকা।

হতবিহ্বল পরিবার অনেক কষ্টে চার লাখ ২০ হাজার টাকা ইসলামী ব্যাংকের একটি অ্যাকাউন্টে পাঠায়। এরপর বিকাশে আরও টাকা পাঠায়। নগদ টাকা নিতে এসে চলতি বছরের এপ্রিলে চক্রের আবুল নামে এক সদস্য পুলিশ কর্তৃক গ্রেপ্তারের পর আড়াইহাজার থানায় একটি মানবপাচারের মামলা করেন বড় ভাই আবুল কালাম আজাদ। এই খবরে জহিরুলের ওপর নেমে আসে অমানবিক নির্যাতন। জানানো হয়, জহিরুল আর জীবিত ফিরবেন না।

পরবর্তীতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তদন্ত করতে গিয়ে জানতে পারে, শুধু জহিরুল নয়, মালয়েশিয়ায় উন্নত জীবনের প্রলোভন দেখিয়ে নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার উপজেলা থেকে মোট ১৯ যুবককে মিয়ানমারে আটকে রাখা হয়েছে। তাদের জন্য মুক্তিপণ দাবি করা হয়। সেখানে বন্দিদশায় নির্যাতনের ফলে জহিরুল মৃত্যুবরণ করেন।

আন্তর্জাতিক মানবপাচার চক্রের মূলহোতা মো. ইসমাইলকে তার দুই সহযোগীসহ নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদী এলাকা থেকে গ্রেপ্তারের পর এ তথ্য দিয়েছে ভুক্তভোগী পরিবার ও র‍্যাব।

গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন- আন্তর্জাতিক মানবপাচার চক্রের মূলহোতা মো. ইসমাইল (৪৫), তার সহযোগী মো. জসিম (৩৫) এবং মো. এলাহী (৫০)। তারা মানবপাচার চক্রের বিষয়ে বিভিন্ন তথ্য দিয়েছেন বলে দাবি র‌্যাবের।

শনিবার (১৯ আগস্ট) দুপুরে রাজধানীর কারওয়ান বাজার র‌্যাব মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে একথা বলেন, র‍্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন।

তিনি বলেন, চলতি বছরের ১৯ মার্চ নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার এলাকার ১৯ জন যুবক মানবপাচার চক্রের মাধ্যমে টেকনাফ থেকে নৌ-পথে মালয়েশিয়া যাওয়ার সময় মিয়ানমারের কোস্টগার্ডের হাতে আটক হয়। এঘটনায় গত ১৫ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার থানায় মানবপাচার আইনে মামলা দায়ের করেন ভুক্তভোগী পরিবার।

পরবর্তীতে অন্য পরিবারের পক্ষ থেকে সদস্যরা আড়াইহাজার উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে গিয়ে নিখোঁজ স্বজনদের ফিরে পেতে সরকারি উদ্যোগ নেওয়ার আবেদন করা হয়।

চক্রের মাধ্যমে মালয়েশিয়া পাচার হওয়া জহিরুল ইসলাম গত ২৪ মে মালয়েশিয়ার একটি হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন এবং গত ২৮ মে বাংলাদেশ সরকারের শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় তার লাশ দেশে নিয়ে আসা হয়। র‌্যাব এই মানব পাচার চক্রের সদস্যদের গ্রেপ্তারে গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করে ও মূলহোতাসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

রোহিঙ্গাদের নিয়ে ইসমাইলের মানবপাচার চক্র : গ্রেপ্তারদের জিজ্ঞাসাবাদে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে কমান্ডার মঈন বলেন, চক্রের মূলহোতা ইসমাইল গত ২০০১-২০০৫ পর্যন্ত মালয়েশিয়া অবস্থানকালীন মায়ানমারের আরাকানের নাগরিক (রোহিঙ্গা) রশিদুল ও জামালের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। পরবর্তীতে ইসমাইল দেশে ফিরে এসে রোহিঙ্গা রশিদুল ও জামালকে নিয়ে ১০-১২ জনের একটি আন্তর্জাতিক মানবপাচার চক্রের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তোলে। এরপর মানব পাচার শুরু করে।

গত ১০ বছর ধরে মানবপাচারের এই চক্রটি চালিয়ে আসছে। নারায়ণগঞ্জে বসে দেশে-বিদেশে থাকা সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চক্রটি চালিয়ে আসছিল। তার বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন থানায় একাধিক মামলা রয়েছে।

ভিসাপাসপোর্ট ছাড়াই বিদেশ পাঠানোর ফাঁদ : কমান্ডার মঈন বলেন, চক্রের সদস্যরা বিভিন্ন এলাকার তরুণ ও যুবকদেরকে কোনো প্রকার অর্থ ও পাসপোর্ট-ভিসা ছাড়াই সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া পাঠানোর প্রস্তাব দিত। মালয়েশিয়া পৌঁছে ৩ লাখ ২০ হাজার টাকা পরিশোধ করার চুক্তিতে পাঠানো হয়।

নারায়ণগঞ্জ থেকে টেকনাফ, মিয়ানমার হয়ে নৌ পথে মালয়েশিয়া রুট : বেকার তরুণদের মানবপাচার চক্রের সদস্যরা কথিত উন্নত জীবন যাপনের স্বপ্ন দেখান৷ ভাগ্য পরিবর্তন ও উন্নত জীবন যাপনের আশায় যে সকল তরুণ ও যুবক মালয়েশিয়া যেতে চক্রের ফাঁদে পা দেন। তাদেরকে জসিম ও এলাহীসহ চক্রের অন্য সদস্যরা সংগ্রহ শেষে ইসমাইলের কাছে নিয়ে আসেন। এরপর তাদেরকে নারায়ণগঞ্জ থেকে বাসে করে কক্সবাজার জেলার টেকনাফের মানবপাচার চক্রের আরেক সদস্য আলমের কাছে নেওয়া হতো। টেকনাফের আলম ভুক্তভোগীদেরকে কয়েক দিন রেখে সুবিধাজনক সময়ে তাদেরকে ট্রলারে করে মায়ানমারে জামালের কাছে পাঠাতেন। এরপর মিয়ানমারে গোপন ক্যাম্পে নিয়ে জিম্মি করে নির্যাতনের মুখে মুক্তিপণ দাবি করতেন জামাল। নির্যাতনের ভিডিও ধারণ করে তা ইসমাইলের মাধ্যমে পরিবারের কাছে পাঠিয়ে ৬ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করতেন।

মুক্তিপণ না দিলে ভুক্তভোগীদের নির্মমভাবে নির্যাতন করা হতো। যে সকল ভুক্তভোগীর পরিবার মুক্তিপণের আদায় শেষে তাদেরকে মায়ানমার থেকে থাইল্যান্ডের সমুদ্রসীমা হয়ে মালয়েশিয়ায় চক্রের সদস্য রশিদুলের কাছে পাঠানো হয়।

গ্রেপ্তার ইসমাইল নিজের ও অন্যান্য সদস্যদের অংশের টাকা রেখে অবশিষ্ট টাকা মালয়েশিয়া অবস্থানরত রশিদুলের কাছ থেকে মোবাইল ব্যাংকিং ও ব্যাংকের মাধ্যমে প্রেরণ করতেন। পরবর্তীতে মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত রশিদুল ও মায়ানমারে অবস্থানরত জামাল মুক্তিপণের টাকা ভাগ করে নিতেন বলে জানা যায়।

কমান্ডার আরও মঈন বলেন, রাশিদুল প্রায় ২৫ বছর ধরে মালয়েশিয়ায় অবস্থান করছেন। প্রায় ২০ বছর তিনি মানবপাচার চক্রের সঙ্গে জড়িত।

জিজ্ঞাসাবাদে প্রাপ্ত তথ্যের বরাতে কমান্ডার মঈন বলেন, চক্রটি চলতি বছরের গত ১৯ মার্চ মোট ২২ জনকে ট্রলারে করে অবৈধভাবে মালয়েশিয়ায় পাচার করার সময় মিয়ানমার উপকূলে পৌঁছলে মায়ানমার কোস্টগার্ড ১৯কে আটক করে। বাকি ৩ জনকে এই চক্রের সদস্য মায়ানমারের জামাল কৌশলে ছাড়িয়ে নিয়ে তার ক্যাম্পে নিয়ে মুক্তিপণের জন্য নির্যাতন করে। এদের মধ্যে ছিল জহিরুলও। তার পরিবারের কাছে ৬ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করেন চক্রের সদস্যরা। পরবর্তীতে জহিরুলের পরিবার গত ১০ মে ৪ লাখ ২০ হাজার টাকা মুক্তিপণ দেয় বাকি ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা মালয়েশিয়া যাওয়ার পর দেবে বলে জানায়।

পরবর্তীতে জহিরুলকে গত মে মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে মায়ানমার থেকে থাইল্যান্ডের সমুদ্র সীমা হয়ে সিঙ্গাপুরের পাশ দিয়ে মালয়েশিয়া পাঠানো হয়। নির্যাতনের কারণে সে অসুস্থ হয়ে পড়লে মালয়েশিয়া পুলিশের মাধ্যমে তিনি হাসপাতালে ভর্তি হন। পরবর্তীতে গত ২৪ মে সেখানে চিকিৎসারত অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। মৃত্যুর সনদপত্রে তার মৃত্যুর কারণ হিসেবে তার শরীরে নির্যাতনের কথা উল্লেখ আছে।

গ্রেপ্তার জসিম ও এলাহী সম্পর্কে র‍্যাবের মুখপাত্র বলেন, চক্রটির অন্যতম সহযোগী। তারা নারায়ণগঞ্জে অবস্থান করে বিভিন্ন এলাকা থেকে বিদেশগামীদের সংগ্রহে কাজ করে ইসমাইলের নিকট নিয়ে আসতো। তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় একাধিক মামলা আছে।

মানবপাচারকারী চক্রে নির্যাতনে নিহত ভুক্তভোগী জহিরুলের বড় ভাই আবুল কালাম আজাদ র‍্যাব মিডিয়া সেন্টারে বসে বলেন, ২০০৬ সাল থেকে আমাদের পারিবারিক ব্যবসা। মা সাইন প্রিন্টিং প্রেসে আমার সঙ্গেই কাজ করতো জহিরুল। হঠাৎ মার্চে দোকানের পাশ থেকে জহিরুলকে মেরে উঠিয়ে নিয়ে যায় মানবপাচারকারীরা। এক মাস নিখোঁজ ছিল জহিরুল। এরপর যোগাযোগ হয়। নির্যাতন করে টাকা চায়। আমরা টাকাও দিই। কিন্তু ভাইকে আর ফিরে পাইনি। এপ্রিল মাসে মামলার পর জহিরুলের ওপর নির্যাতন আরও বেড়ে যায়। কোনোদিন আর ফিরে পাবো না বলে হুমকি দিয়েছিলো জামাল।

আজাদ বলেন, এ কেমন উন্নত জীবন! ভিসা-পাসপোর্ট ছাড়া বিদেশ যাওয়া যায় না। আমার ভাইটা বিবাহিত। ওর দেড় বছরের ছেলে ও সাত বছর বয়সী ছোট্ট মেয়ে আছে। মানবপাচারকারীদের খপ্পড়ে পড়ে পুরো পরিবার আজ পথে বসার দশা। উন্নত জীবনের বদলে ভাইটাকে আমার মরতে হলো। জড়িত চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ ও শাস্তি চাই।

 

আজকের বাংলা তারিখ

September ২০২৬
Mon Tue Wed Thu Fri Sat Sun
« Aug    
 
১০১১১২১৩
১৪১৫১৬১৭১৮১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
২৮২৯৩০  


Our Like Page