অনলাইন সীমান্তবাণী ডেস্ক : সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়া নিয়ে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক যখন তলানিতে, ঠিক তখন দিল্লীতে কীভাবে সংবাদ সম্মেলনে তার অডিও বক্তব্য শোনানো হলো? ভারত সরকারই কি তাহলে শেখ হাসিনাকে এই বক্তব্য রাখার সুযোগ করে দিয়েছে? বাংলাদেশ সরকার বিষয়টিকে কীভাবে দেখছে? দিল্লীতে শেখ হাসিনার এই অডিও ভাষণ দু’দেশের সম্পর্কে নতুন করে কোন বিরূপ প্রভাব রাখবে কি? কী বলছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা? চলুন জেনে নেই আদ্যোপান্ত।
জুলাই বিপ্লবে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়া শেখ হাসিনাকে রাজনৈতিক সমাবেশ কিংবা মূলধারার গণমাধ্যমের সঙ্গে সাক্ষাতকারের সুযোগ করে দেওয়ায় দেশটির সরকারের সঙ্গে বেশ কয়েকবার বাংলাদেশের সম্পর্কের টানাপোড়েন হয়েছে। এমনই এক সাক্ষাতকারের ঘটনায় গত নভেম্বরে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের ডেপুটি হাইকমিশনার পবন বাদেহকে তলব করে গভীর উদ্বেগ জানিয়েছিল বাংলাদেশ। এছাড়া বিভিন্ন সময় হাইকমিশনারকে তলবের ঘটনাও ঘটেছে। সেসময় ঢাকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামিকে আশ্রয় দেওয়া এবং তাকে বাংলাদেশবিরোধী বিদ্বেষ ছড়ানো ও দেশে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে উসকানি দেওয়ার মতো বক্তব্য প্রচারের সুযোগ করে দেওয়া দুই দেশের গঠনমূলক দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের জন্য ‘অসহায়ক ও অনভিপ্রেত’। উত্তরে দিল্লী বলে আসছে, এসব বক্তব্য শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত, এর পেছনে ভারতের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। তবে এবার আর কোন সাক্ষাতকার নয়, দিল্লীতে আগাম ঘোষণা দিয়ে রীতিমতো সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনার বক্তব্য বাজিয়ে শোনানো হয়েছে। ভারতে কর্মরত বিদেশি সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিকদের সাথে হওয়া এই অনুষ্ঠানে তিনি সশরীর হাজির হননি, অডিও বার্তা দিয়েছেন। সেই বার্তায় পুরনো চিরচেনা রূপেই আবির্ভূত হয়েছেন তিনি। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে তোপ দাগিয়ে নিশানা করেছেন শেখ হাসিনা। ক্ষমতা দখলের অভিযোগের পাশাপাশি বর্তমান সরকারের নানা কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করেছেন। অর্থাৎ বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে তার যে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য বন্ধের দাবি করা হয়েছিল, সেটি বন্ধ না করে উল্টো ফরেইন করেসপন্ডেন্টদের সাথে সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনার ওইরকম বক্তব্য শোনানো হয়েছে।
এ ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে যে, ভারত সরকার কি তাহলে আগের অবস্থান থেকে সরে এসেছে? ভারত সরকারের অনুমোদন ছাড়া কি দিল্লীর ফরেইন করেসপন্ডেন্টদের উদ্দেশে তার বক্তব্য বাজিয়ে শোনানো সম্ভব?
কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ভারত সরকারের অনুমোদন ছাড়া এটি কোনোভাবেই সম্ভব নয়। শেখ হাসিনা সেখানে আশ্রয়ে রয়েছেন, তার সকল কর্মকাণ্ডই আশ্রয়দাতাদের নখদর্পণে রয়েছে। এর আগে বাংলাদেশ সরকার এবং কিছু রাজনৈতিক দলের দিক থেকে জোরালো প্রতিবাদী অবস্থান থাকায় ভারত তাকে থামাতে বাধ্য হয়েছিল। কিন্তু বাংলাদেশে এখন যেহেতু সরকার এবং রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ত, সেটিকেই সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করেছেন শেখ হাসিনা। এজন্য ভারতও এবার তাকে থামায়নি। এছাড়া ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ খুব বেশি বাকি না থাকায় ভারত শেখ হাসিনাকে সংবাদ সম্মেলনের অনুমতি দিয়ে থাকতে পারে বলেও বিশ্লেষকরা মনে করছেন। দিল্লী প্রেসক্লাবের সভাপতি গৌতম লাহিড়ী এক আলোচনায় বলে রেখেছেন, শেখ হাসিনা নিকট ভবিষ্যতে ভিডিও কনফারেন্সে এবং পরবর্তীতে এমন কোন অনুষ্ঠানে সশরীরেও উপস্থিত হতে পারেন।
ভারতে বসে শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেওয়ার এই সুযোগকে বাংলাদেশ কীভাবে দেখছে? এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় দুদিন আগে বিবিসি ইন্ডিয়াকে দেওয়া পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেনের এক সাক্ষাতকারে। সেখানে আলাপচারিতার একপর্যায়ে তিনি বলেছেন, শেখ হাসিনা ভারতে গিয়েছেন এবং সেখানে তাকে আশ্রয় দেওয়া হয়েছে। আমরা যেটা প্রত্যাশা করেছিলাম তা হলো, যতদিন তিনি সেখানে থাকবেন, তিনি এমন কোনো বক্তব্য দেয়া থেকে বিরত থাকবেন যা বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতির সাথে যায় না এবং যা দুই দেশের সম্পর্কের জন্যও শুভ নয়। কিন্তু বাংলাদেশের যে সংবেদনশীলতার জায়গাগুলো রয়েছে, ভারত সেগুলোকে যথাযথভাবে গুরুত্ব দেয়নি বা যত্ন নেয়নি।
ঢাকা ও দিল্লীর কূটনৈতিক তলব-পাল্টা তলব, দিল্লীর বাংলাদেশ হাউজে হিন্দুত্ববাদী উগ্র গোষ্ঠীর হামলা, বাংলাদেশকে ভারতের নন ফ্যামিলি পোস্টিং ঘোষণা করে মিশনগুলো থেকে কূটনীতিকদের পরিবারকে দেশে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ, ক্রিকেটার মোস্তাফিজ ইস্যুতে বিশ্বকাপ খেলা নিয়ে অনিশ্চয়তা- অর্থাৎ বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক সর্বকালের তলানিতে থাকার সময় দিল্লীতে নতুন করে শেখ হাসিনাকে সংবাদ সম্মেলন করতে দেওয়ার রেশ কতদূর গড়ায় সেটিই এখন দেখার বিষয়। তবে উভয় প্রতিবেশী দেশেরই উচিৎ, পরস্পরের সংবেদনশীল বিষয়ের প্রতি যথাযথ সম্মান ও শ্রদ্ধাবোধ প্রদর্শন করে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের পথে হাঁটা, এমনটাই বলছেন বিশ্লেষকরা।