মাগুরা প্রতিনিধি : মাগুরা হর্টিকালচার সেন্টারের অফিস প্রধান ও উদ্যানতত্ত্ববিদ মোঃ শাহিনুজ্জামান (বি.সি.এস ৩৮তম) এর বিরুদ্ধে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, ভুয়া বিল-ভাউচার, হাজিরা জালিয়াতি, প্রকল্প সরঞ্জাম ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার, সরকারি ফল আত্মসাৎ এবং কৃষক প্রশিক্ষণে অনিয়মসহ একাধিক গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, অফিসে সরকারি গাড়ি থাকা সত্ত্বেও সেটিকে সচল না রেখে ইচ্ছাকৃতভাবে অকেজো করে রাখা হয়েছে। ফলে সরকারি গাড়ি ব্যবহার না করে অফিস প্রধান তার নিজস্ব ব্যক্তিগত প্রাইভেটকার (ঢাকা মেট্রো-গ-৩৯-২২৬৬) ব্যবহার করছেন। অথচ ওই ব্যক্তিগত গাড়িতেই সরকারি বরাদ্দকৃত পেট্রোল অথবা অকটেন, ওয়েল ও লুব্রিকেন্ট ব্যবহার করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সরকারি গাড়িটির আনুমানিক মূল্য ২৫ থেকে ৩০ লাখ টাকা।
সরকারি গাড়ি, জ্বালানি ও মেরামত বরাদ্দ নিয়ে প্রশ্ন চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরের আগস্ট মাসে মাগুরা হর্টিকালচার সেন্টারের জন্য সরকারি ভাবে পেট্রোল অথবা অকটেন, ওয়েল ও লুব্রিকেন্ট বাবদ বরাদ্দ ৪৫,০০০ টাকা, সরকারি গাড়ি মেরামত বাবদ বরাদ্দ ৩০,০০০ টাকা, কৃষকের কাছে সরাসরি সেবা পৌঁছাতে ভ্রমণ ব্যয় বরাদ্দ ৫৫,০০০ টাকা।

অভিযোগ রয়েছে, সরকারি গাড়ি মেরামতের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ থাকা সত্ত্বেও গাড়িটি মেরামত করা হয়নি। বরং সরকারি জ্বালানি ও ভ্রমণ ব্যয়ের অর্থ উত্তোলন করে তা অফিস প্রধান তার ব্যক্তিগত গাড়িতে ঝিনাইদহ থেকে প্রতিদিন অফিসে আসা–যাওয়ার কাজে ব্যবহার করেছেন, যা সরকারি বিধি-বিধানের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
উন্নয়ন ও উৎপাদন খাতে ভুয়া বিলের অভিযোগ অত্র সেন্টারের উন্নয়ন ও উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন খাতে মোট ৩,৯৩,৫০০ টাকা বরাদ্দ আসে। এর মধ্যে সার বাবদ ৪৯,০০০ টাকা, কীটনাশক বাবদ ২১,০০০ টাকা,
বীজ ও চারা ক্রয় বাবদ ১,১৫,০০০ টাকা, অন্যান্য মনিহারি ৩৭,০০০ টাকা, মুদ্রণ ১০,০০০ টাকা, যন্ত্রপাতি মেরামত ৯,০০০ টাকা।

অভিযোগ রয়েছে, এসব অর্থ ভুয়া বিল ও ভাউচারের মাধ্যমে উত্তোলন করা হয়েছে। চলতি জানুয়ারি মাসে একই খাতে পুনরায় বরাদ্দ আসলেও একইভাবে অর্থ আত্মসাৎ অব্যাহত রয়েছে বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন।
হাজিরা জালিয়াতি ও অবৈধ লেনদেনের অভিযোগ
রাজস্ব খাতের ফার্ম লেবার আব্দুল ওয়াহেদের বিরুদ্ধে হাজিরা জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী
সেপ্টেম্বর মাসে মাত্র ২ দিন উপস্থিত থেকেও পুরো মাসের হাজিরা অক্টোবর মাসে একদিনও উপস্থিত না থেকেও ২২ কর্মদিবসের হাজিরা
নভেম্বর মাসে ১৬ তারিখ পর্যন্ত অনুপস্থিত থেকেও হাজিরা স্বাক্ষর।
সূত্রের দাবি, এসব ঘটনায় অফিস প্রধানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর অবৈধ আর্থিক লেনদেন রয়েছে।
গোপন কক্ষে অনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার অভিযোগ
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, অফিসে একজন উচ্চমান সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর পদে কর্মকর্তা থাকা সত্ত্বেও তাকে দায়িত্ব না দিয়ে মাঠ পর্যায়ের ফার্ম লেবার মোঃ এহিয়া মিয়াকে অফিসারের কক্ষসংলগ্ন একটি গোপন কক্ষে বসিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন অনৈতিক ও আর্থিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা হচ্ছে।
সূত্রের দাবি, বিল-ভাউচার প্রস্তুত, হাজিরা সংক্রান্ত কাগজপত্র এবং অর্থ উত্তোলনসংক্রান্ত কার্যক্রমে ওই শ্রমিককে ব্যবহার করা হচ্ছে, যা সরকারি দাপ্তরিক শৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক বিধিমালার চরম লঙ্ঘন।

অনিয়মিত শ্রমিক খাতে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ
এছাড়া অনিয়মিত শ্রমিকদের জন্য বরাদ্দকৃত ৪,১৫,৮০০ টাকা উত্তোলনের ক্ষেত্রেও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, এক শ্রমিক মোঃ তৌহিদুরজ্জামান ছয় মাস আগে চাকরি ছেড়ে চলে গেলেও তার নামে গত আগস্ট, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে ভুয়া স্বাক্ষরের মাধ্যমে প্রতি মাসে ১৫,৪০০ টাকা করে উত্তোলন করা হয়েছে।
মাশরুম উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম
মাশরুম উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য বরাদ্দকৃত ২ টন ক্ষমতার একটি এসি কৃষকদের কাজে ব্যবহার না করে অফিস প্রধান নিজের অফিস কক্ষে বিলাসিতার জন্য ব্যবহার করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
কৃষক প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে জনপ্রতি নাস্তা বাবদ ৪০ টাকা এবং দুপুরের খাবার বাবদ ২৫০ টাকা বরাদ্দ থাকলেও বাস্তবে নিম্নমানের খাবার পরিবেশন করা হয়েছে বলে প্রশিক্ষণার্থীরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
সরকারি ফল উৎপাদন ও বিক্রির অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ
অভিযোগ সূত্রে আরও জানা গেছে, মাগুরা হর্টিকালচার সেন্টারের আওতাধীন সরকারি বাগান ও উৎপাদন প্লট থেকে উৎপাদিত ডাব, সফেদা, বেল, জাম্বুরা ও অন্যান্য মৌসুমি ফল সরকারি নিলাম বা রশিদভিত্তিক বিক্রির পরিবর্তে অফিস প্রধান ব্যক্তিগতভাবে একাই ভোগ ও বিক্রি করে আসছেন।
স্থানীয় কৃষক ও সংশ্লিষ্টদের দাবি, এসব ফল বিক্রির অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা না দিয়ে আত্মসাৎ করা হয়েছে, যার কোনো আনুষ্ঠানিক হিসাব বা রেকর্ড পাওয়া যায়নি।
চারা বিক্রির অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ
মোহাম্মদপুর উপজেলায় এক কৃষকের কাছে সরকারি চারা বিক্রি করে ১,৮০,০০০ টাকা আদায় করা হলেও কোনো সরকারি রশিদ দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কৃষক এবং ওই অফিসের এক শ্রমিক দাবি করেন, বিক্রয়কৃত অর্থ অফিস প্রধান আত্মসাৎ করেছেন।
অভিযোগের বিষয়ে মাগুরা হর্টিকালচার সেন্টারের অফিস প্রধান ও উদ্যানতত্ত্ববিদ মোঃ শাহিনুজ্জামান তার কাছে বিষয়টির ব্যাখ্যা চাইলে গড়িমসি করে এড়িয়ে যায় এবং এবিষয়ে কোন মন্তব্য করে নাই।
উদ্যোক্তা মাশরুম উন্নয়ন প্রকল্প মোসাঃ নাজমা বলেন, প্রশিক্ষণের নাস্তা ও দুপুরের খাবার নিম্ন মানের ছিলো সকালে ১০-১৫ টাকার খাবার ১২০ টাকার খাবার সর্বোচ্চ।
পরবর্তী সংবাদে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত ও দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় কৃষক ও সচেতন মহল।