অনলাইন সীমান্তবাণী ডেস্ক : চাঁদকে ঘিরে সফল পরীক্ষামূলক অভিযান সম্পন্ন করে পৃথিবীতে ফিরে এসেছেন নাসার চার নভোচারী। শুক্রবার ক্যালিফোর্নিয়া উপকূলের কাছে প্রশান্ত মহাসাগরে তাদের মহাকাশযান পরিকল্পনামতো অবতরণ করে। ৫০ বছরেরও বেশি সময় পর এই প্রথম কোনো মানববাহী মহাকাশযান চাঁদকে প্রদক্ষিণ করল।
মিশন কমান্ডার রিড ওয়াইজম্যান জানিয়েছেন, তিনিসহ ক্রু সদস্য ক্রিস্টিনা কোচ, ভিক্টর গ্লোভার এবং জেরেমি হ্যানসেন সবাই ‘সুস্থ ও স্বাভাবিক’ আছেন।
নাসার লাইভস্ট্রিমে তাদের ফেরার দৃশ্য বর্ণনা করার সময় পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কর্মকর্তা রব নাভিয়াস বলেন, ‘তারা চমৎকার শারীরিক অবস্থায় আছেন।’
বায়ুমণ্ডলে পুনরায় প্রবেশের সময় চরম উত্তেজনার মাঝে কয়েক মুহূর্তের জন্য যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। এরপর ওয়াইজম্যানের কণ্ঠস্বর শোনা মাত্রই কন্ট্রোল রুমে স্বস্তি ফিরে আসে। হিউস্টন মিশন কন্ট্রোল থেকে ভয়েস চেক করার পর তিনি বলেন, ‘আমরা আপনাদের কথা স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি।’
এখন নাসা ও মার্কিন সামরিক বাহিনী সাগরে ভাসমান ক্যাপসুলটি থেকে নভোচারীদের বের করে আনতে সহায়তা করবে। এরপর সেখান থেকে তাদের সান দিয়াগোর অদূরে প্রশান্ত মহাসাগরে অপেক্ষমান উদ্ধারকারী জাহাজে নিয়ে যাওয়া হবে।
পৃথিবীতে ফেরার পথে মহাকাশযানটি শব্দের চেয়ে ৩০ গুণেরও বেশি গতিতে ছুটছিল। এসময় যানটির চারপাশের তাপমাত্রা সূর্যের উপরিভাগের তাপমাত্রার প্রায় অর্ধেক পর্যন্ত পৌঁছে যায়। এটি ছিল মূলত যানটির হিট শিল্ড বা তাপ সুরক্ষা কবচের একটি বড় পরীক্ষা। কারণ এর আগের একটি পরীক্ষামূলক মিশনে এই শিল্ড নিয়ে কিছু জটিলতা দেখা দিয়েছিল।
তবে আর্টেমিস ২-এর ক্ষেত্রে সবকিছুই কোনো বাধা ছাড়াই সম্পন্ন হয়েছে। নাভিয়াস বলেন, ‘এটি ছিল একটি আদর্শ মানের প্রবেশ এবং অবতরণ।’
নাসা প্রশাসক জ্যারেড আইজ্যাকম্যান এই সফরকে একটি ‘নিখুঁত মিশন’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা আবারও চাঁদে নভোচারী পাঠানোর ধারায় ফিরে এসেছি। আর এটি কেবল শুরু।’
তিনি আরও বলেন, ‘২০২৮ সালে চাঁদে পা রাখা এবং সেখানে আমাদের ঘাঁটি তৈরির আগ পর্যন্ত আমরা এখন নিয়মিত বিরতিতে এই মিশনগুলো চালিয়ে যাব।’
উৎক্ষেপণ থেকে অবতরণ পর্যন্ত এই অভিযানে সময় লেগেছে ৯ দিন ১ ঘণ্টা ৩১ মিনিট ৩৫ সেকেন্ড। তবে নাসা এটিকে ১০ দিনের মিশন হিসেবেই গণ্য করছে।
গত ১ এপ্রিল ফ্লোরিডা থেকে চমকপ্রদ উৎক্ষেপণের মধ্য দিয়ে এই যাত্রা শুরু হয়েছিল। পুরো অভিযানটি ছিল অসংখ্য রেকর্ড ও অনন্য সব মুহূর্তে ঘেরা।
চাঁদে মানুষের টেকসই উপস্থিতি বজায় রাখতে নাসা’র ‘আর্টেমিস’ কর্মসূচির মধ্যে, এটিই হলো প্রথম মানববাহী মিশন। কর্মসূচির এই দ্বিতীয় ধাপের মূল লক্ষ্য ছিল ওরিয়ন ক্যাপসুলের নির্ভরযোগ্যতা যাচাই করা, যা এর আগে কখনও মানুষ বহন করেনি।
এই অভিযানে একটি নতুন রেকর্ডও তৈরি হয়েছে। এই চার নভোচারী পৃথিবী থেকে সর্বোচ্চ ২ লক্ষ ৫২ হাজার ৭৫৬ মাইল (৪ লক্ষ ৬ হাজার ৭৭১ কিলোমিটার) দূরে ভ্রমণ করেছেন, যা মানব ইতিহাসে পৃথিবী থেকে সবচেয়ে দূরে যাওয়ার রেকর্ড।
গভীর মহাকাশে ছুটে চলা এবং চাঁদের চারপাশ ঘুরে আসার সময় নভোচারীরা হাজার হাজার ছবি তুলেছেন। তাদের সেই অসাধারণ ছবিগুলো পৃথিবীবাসীকে মুগ্ধ করেছে। এছাড়া তারা মহাকাশ থেকে সূর্যগ্রহণ এবং চাঁদের বুকে উল্কাপাতের বিরল দৃশ্যও প্রত্যক্ষ করেছেন, যা নাসার বিজ্ঞানীদের অবাক করে দিয়েছে।
এই সফরের বেশ কিছু অনন্য অর্জন রয়েছে। ভিক্টর গ্লোভার ছিলেন প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তি যিনি চাঁদের কক্ষপথে ভ্রমণ করেছেন। ক্রিস্টিনা কোচ প্রথম নারী এবং কানাডীয় জেরেমি হ্যানসেন ছিলেন প্রথম অ-মার্কিন নাগরিক যিনি এই গৌরবের অংশীদার হলেন।
ওরিয়ন ক্যাপসুলটি একটি অত্যন্ত কঠিন পরীক্ষা পাশ করেছে। ২০২২ সালে আর্টেমিস ১-এর মনুষ্যবিহীন পরীক্ষামূলক ফ্লাইটে হিট শিল্ডটি অপ্রত্যাশিতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। তাই এবার ঝুঁকি কমাতে নাসা অবতরণের পথ কিছুটা পরিবর্তন করেছিল।
নভোচারীদের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে এবার অপেক্ষাকৃত খাড়া ও সংক্ষিপ্ত পথে তাদের ফিরিয়ে আনা হয়, যাতে ঝুঁকি সর্বনিম্ন পর্যায়ে থাকে। ওরিয়ন ক্যাপসুলটি এখন নিবিড়ভাবে পরীক্ষা করে দেখা হবে।
তবে নাসা, নভোচারী ও তাদের পরিবার এবং বিশ্ববাসীর জন্য স্বস্তির বিষয় হলো, আর্টেমিস-২ সফলভাবে চারজন সুস্থ নভোচারীকে ফিরিয়ে আনতে পেরেছে। হিউস্টনের মিশন কন্ট্রোল থেকে তাদের প্রিয়জনরা এই অবতরণ দৃশ্য প্রত্যক্ষ করেন। চলতি সপ্তাহারে শেষেই নভোচারীদের সঙ্গে তাদের পরিবারের আবার দেখা হওয়ার কথা রয়েছে।