অনলাইন সীমান্তবাণী ডেস্ক : আন্তর্জাতিক মহলের চলমান ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি ও তীব্র কূটনৈতিক তৎপরতার তোয়াক্কা না করেই ইরানের অভ্যন্তরে আবারও নতুন করে বড় ধরনের সামরিক হামলা চালিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন সশস্ত্র বাহিনীর দাবি অনুযায়ী, পারস্য উপসাগরের কৌশলগত হরমুজ প্রণালিতে অবস্থিত ইরানের কেশম দ্বীপে তারা এই বিশেষ ‘আত্মরক্ষামূলক’ সামরিক অভিযান পরিচালনা করেছে।
মার্কিন এই ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পরপরই দ্বীপটির বিভিন্ন সামরিক ও কৌশলগত এলাকায় দফায় দফায় শক্তিশালী বিস্ফোরণের খবর নিশ্চিত করেছে ইরানের স্থানীয় গণমাধ্যমগুলো।
বুধবার (৩ জুন) এই বর্বরোচিত আগ্রাসনের জবাবে তেহরানের পক্ষ থেকেও মার্কিন ঘাঁটিতে পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দাবি করা হয়েছে, যার ফলে পুরো মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে নতুন করে যুদ্ধের তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে।
যুক্তরাজ্যের প্রধান সংবাদমাধ্যম বিবিসি ওয়ার্ল্ড নিউজের এক বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড বা সেন্টকম আনুষ্ঠানিকভাবে দাবি করেছে যে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন মার্কিন মিত্র দেশে ও বাণিজ্যিক জাহাজে ইরানের পক্ষ থেকে চালানো কথিত ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার চেষ্টার জবাব দিতেই তারা এই পাল্টা হামলাটি পরিচালনা করেছে।
এর আগে সেন্টকমের নিয়মিত নৌ অবরোধ কার্যক্রমের অংশ হিসেবে মার্কিন যুদ্ধবিমান থেকে ইরানের দিকে অগ্রসর হওয়া বতসোয়ানার পতাকাবাহী একটি খালি তেলবাহী ট্যাংকারের ইঞ্জিন কক্ষ লক্ষ্য করে একটি শক্তিশালী ‘হেলফায়ার’ ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়, যার ফলে জাহাজটি সাগরেই সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়ে। বারবার সতর্কবার্তা উপেক্ষা করার পর এই চরম পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে মার্কিন বাহিনী গতকাল মঙ্গলবার উক্ত হামলার একটি বিশেষ ভিডিও ফুটেজও প্রকাশ করেছে, যদিও এই বিষয়ে ইরান সরকার প্রকাশ্য কোনো মন্তব্য করেনি।
এদিকে মার্কিন বাহিনীর এই আগ্রাসনের তীব্র জবাবে ইরানের এলিট ফোর্স ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসি জানিয়েছে, তারা এই অঞ্চলের একটি নির্দিষ্ট প্রতিবেশি দেশে অবস্থিত মার্কিন প্রধান সামরিক ঘাঁটি ও যুদ্ধবিমান লক্ষ্য করে একযোগে একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র ও আত্মঘাতী ড্রোন হামলা চালিয়েছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের দাবি, কেশম দ্বীপের দক্ষিণে অবস্থিত আইআরজিসির একটি প্রধান যোগাযোগ টাওয়ারে মার্কিন বিমান হামলার সুনির্দিষ্ট প্রতিক্রিয়ায় তেহরানের পক্ষ থেকে এই জোরালো পাল্টা পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। মার্কিন সেন্টকমের ভাষ্য অনুযায়ী, কেশম দ্বীপে তাদের মূল লক্ষ্যবস্তু ছিল একটি ইরানি সামরিক নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র। এর পাশাপাশি আঞ্চলিক আন্তর্জাতিক সমুদ্রসীমা দিয়ে চলাচলকারী বেসামরিক জাহাজের দিকে ধেয়ে আসা ইরানের তিনটি আত্মঘাতী হামলাকারী ড্রোনও মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিখুঁতভাবে ভূপাতিত করেছে।
মার্কিন সামরিক কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তেহরানের পক্ষ থেকে কুয়েতে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটির দিকে দুটি দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছিল, তবে তা মূল লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছানোর আগেই মাঝ আকাশে ভেঙে পড়ে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়। একই সময়ে বাহরাইনের দিকে ইরান ও তার আঞ্চলিক মিত্রদের ছুড়ে দেওয়া আরও তিনটি শক্তিশালী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মার্কিন প্যাট্রিয়ট এয়ার ডিফেন্স সিস্টেমের মাধ্যমে সফলভাবে প্রতিহত করা হয়েছে।
তুর্কি বার্তাসংস্থা আনাদোলু জানিয়েছে, আজ বুধবার ভোরে কেশম দ্বীপে একাধিক ভয়াবহ বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে বলে ইরানের গণমাধ্যম নিশ্চিত করেছে। ইরানের আধা-সরকারি মেহর বার্তাসংস্থা জানায়, দ্বীপটিতে বড় ধরনের বিস্ফোরণের তীব্র শব্দ শোনা গেলেও তাৎক্ষণিকভাবে ক্ষয়ক্ষতির কোনো বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
পরবর্তীতে ইরানের রাষ্ট্রীয় প্রধান সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবি তাদের বিশেষ লাইভ বুলেটিনে জানায়, কেশম দ্বীপের সুজা ও মাসেন এলাকার কাছাকাছি কৌশলগত পয়েন্টগুলোতে কয়েকটি জোরালো বিস্ফোরণ আঘাত হেনেছে। প্রাথমিক সামরিক মূল্যায়নে ধারণা করা হচ্ছে, ওই দুই এলাকার মাঝামাঝি অবস্থিত একটি জনবসতিহীন পাহাড়ি এলাকায় অজ্ঞাত কোনো শক্তিশালী প্রজেক্টাইল বা রকেট এসে আঘাত হেনেছে।
উল্লেখ্য, গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলি বিমানবাহিনী ইরানের ওপর একযোগে নজিরবিহীন বিমান হামলা চালানোর পর থেকেই মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক ভূরাজনীতি চরম বিপজ্জনক আকার ধারণ করে। ওই যৌথ হামলায় ইরানের তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ তিন হাজারের বেশি মানুষ নিহত হন, যাদের মধ্যে দেশের বহু জ্যেষ্ঠ সামরিক জেনারেল ও সরকারের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তারাও অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।
কুয়েতে মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলাকুয়েতে মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা
পরবর্তীতে এই বৈশ্বিক মহামন্দা ও যুদ্ধ পরিস্থিতি নিরসনে প্রতিবেশি দেশ পাকিস্তানের বিশেষ মধ্যস্থতায় গত ৮ এপ্রিল দুই পক্ষের মধ্যে একটি আনুষ্ঠানিক ও সাময়িক যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা সম্ভব হয়েছিল। তবে যুদ্ধবিরতি সাময়িকভাবে বাস্তবায়িত হলেও দীর্ঘমেয়াদি স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য বৃহত্তর কোনো স্থায়ী রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছানোর বৈশ্বিক প্রচেষ্টা এখন পর্যন্ত সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে, যার ফলে দুই দেশের সামরিক বাহিনী আবারও প্রকাশ্য মুখোমুখি ও ধ্বংসাত্মক অবস্থানে চলে এসেছে।