অনলাইন সীমান্তবাণী ডেস্ক : ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার দল আওয়ামী লীগের প্রতীক ‘নৌকা’ এবার কয়েক দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো তাঁর নিজ জেলা গোপালগঞ্জের নির্বাচনী মাঠে অনুপস্থিত। একসময় যে প্রতীক এই জেলার ভোটের সমীকরণ নির্ধারণ করত, এবারের নির্বাচনে তার কোনো দৃশ্যমান উপস্থিতি নেই।
এর বদলে গোপালগঞ্জের দেয়াল, বিদ্যুতের খুঁটি ও গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে মোড়ে দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), জামায়াতে ইসলামী এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ব্যানার ও পোস্টার। তাঁরা ভোটারদের আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে নিজেদের পক্ষে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন।
দীর্ঘদিন ধরেই গোপালগঞ্জ আওয়ামী লীগের সবচেয়ে নিরাপদ ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। এই জেলা থেকেই উঠে এসেছেন শেখ হাসিনা। তাঁর বাবা শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রধান নেতা। শেখ হাসিনা ২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত টানা ১৫ বছরের বেশি সময় দেশ শাসন করেছেন। এ সময় বিরোধী দলগুলো কখনো নির্বাচন বর্জন করেছে, আবার কখনো শীর্ষ নেতাদের গ্রেপ্তার ও দমন–পীড়নের মুখে কোণঠাসা হয়ে পড়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার সরকারের পতন ঘটে। এরপর তিনি ভারতে চলে যান। অভ্যুত্থানের সময় সহিংস কর্মকাণ্ডের অভিযোগে অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে, ফলে দলটি এবারের নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না। নোবেলজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে এই অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। গত অক্টোবরে রয়টার্সকে ই-মেইলে শেখ হাসিনা বলেন, আওয়ামী লীগকে নির্বাচনের বাইরে রাখলে কয়েক কোটি সমর্থক প্রার্থীহীন হয়ে পড়বে এবং এতে বড় অংশ ভোট বর্জনের পথে যেতে পারে।
গোপালগঞ্জ শহরের পোস্টারের নিচে দাঁড়িয়ে রিকশাচালক এরশাদ শেখ বলেন, ‘ওরা যত পোস্টারই লাগাক, ব্যালটে যদি নৌকা না থাকে, তাহলে আমার পরিবারের ১৩ জন ভোটারের কেউই ভোট দিতে যাবে না।’
গত বছরের শেষ দিকে ঢাকার একটি আদালত ২০২৪ সালের অভ্যুত্থান দমনে প্রাণঘাতী দমন–পীড়নের নির্দেশ দেওয়ার দায়ে শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দেন। জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই সময় সর্বোচ্চ ১ হাজার ৪০০ জন নিহত এবং হাজারো মানুষ আহত হন, যাদের অধিকাংশই নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে হতাহত হয়েছেন।
এই প্রেক্ষাপটে বাস্তবতা হলো—আওয়ামী লীগ ভোটারদের একটি অংশ এখন বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর দিকে ঝুঁকছেন। চলতি মাসে প্রকাশিত এক জরিপে দেখা গেছে, সাবেক আওয়ামী লীগ ভোটারদের প্রায় অর্ধেক বর্তমানে বিএনপিকে সমর্থন করছেন। জরিপ অনুযায়ী, প্রায় ৩০ শতাংশ ভোটার জামায়াতে ইসলামীর প্রতি সমর্থন জানাচ্ছেন।
ঢাকাভিত্তিক কমিউনিকেশন অ্যান্ড রিসার্চ ফাউন্ডেশন এবং বাংলাদেশ ইলেকশন অ্যান্ড পাবলিক ওপিনিয়ন স্টাডিজ পরিচালিত ওই জরিপে বলা হয়েছে, সাবেক আওয়ামী লীগ ভোটাররা রাজনীতি থেকে সরে যাচ্ছেন না; বরং নির্দিষ্ট কিছু বিরোধী দলের দিকেই তাঁদের সমর্থন কেন্দ্রীভূত হচ্ছে।
এদিকে গোপালগঞ্জে আওয়ামী লীগ–সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলো জানাচ্ছে, শেখ হাসিনার পতনের পর তাঁদের ব্যক্তিগত জীবনে বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে। শিখা খানম বলেন, তাঁর ৩০ বছর বয়সী ভাই ইব্রাহিম হোসেন আওয়ামী লীগের ছাত্রসংগঠনের কর্মী ছিলেন। গত বছরের জুলাইয়ে একটি সমাবেশকে ঘিরে সহিংসতার ঘটনায় তাঁকে ডিসেম্বর মাসে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁর দাবি, ভাইকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হয়েছে।
এই ঘটনার পর তাঁদের পরিবার রাজনীতি থেকে পুরোপুরি সরে এসেছে। শিখা খানম বলেন, ‘আমরা আর ভোট দেব না। আমাদের রাজনীতি শেষ।’
২০২৪ সালের অভ্যুত্থান স্মরণে ছাত্রদের নেতৃত্বে গঠিত নতুন দল জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ডাকে গোপালগঞ্জে আয়োজিত এক সমাবেশে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে পাঁচজন নিহত হন। কয়েকজন আওয়ামী লীগ কর্মী ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ জানিয়েছেন, তাঁরা এখন আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। রেস্তোরাঁকর্মী মোহাব্বত মোল্লা বলেন, প্রার্থীর সংখ্যা বাড়লেও তাঁর কাছে বাস্তবতা বদলায়নি। তাঁর ভাষায়, ‘আমাদের প্রার্থী এখানে নেই। আওয়ামী লীগ এখানে নেই।’
তবে কেউ কেউ পরিবর্তিত নির্বাচনী পরিবেশে নতুন সম্ভাবনাও দেখছেন। ব্যবসায়ী শেখ ইলিয়াস আহমেদ বলেন, আসন্ন নির্বাচন মানুষকে সত্যিকারের ভোট দেওয়ার সুযোগ এনে দিতে পারে। তাঁর কথায়, ‘আগে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে দেখতাম, আমার ভোট আগেই দেওয়া হয়ে গেছে। এবার আমি বিশ্বাস করতে চাই, পরিস্থিতি বদলাবে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আসিফ শাহান মনে করেন, সাবেক আওয়ামী লীগ ভোটারদের সিদ্ধান্তই এবারের নির্বাচনের ফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে। তিনি বলেন, ‘সারা দেশে নির্বাচন বর্জন হবে বলে আমি মনে করি না। কট্টর সমর্থকেরা হয়তো ভোট দেবেন না। তবে যাঁরা দ্বিধায় আছেন এবং স্থানীয় বিষয়কে গুরুত্ব দেন, তাঁরাই শেষ পর্যন্ত ফল নির্ধারণ করতে পারেন।’