ফারুক আহমেদ, মাগুরা : মাগুরা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের অধীনে ২০১৩ সালে অফিস সহায়ক পদে নিয়োগ পাওয়া গৌতম কুমার বিশ্বাসের চাকরি নিয়ে বয়স, জন্মনিবন্ধন ও শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদে অসঙ্গতির অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারী ও চাকরিপ্রত্যাশীরা।
গৌতম কুমার বিশ্বাস বর্তমানে মাগুরার শালিখা উপজেলার বুনাগাতী ইউনিয়ন ভূমি অফিসে অফিস সহায়ক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি চাকরিতে আবেদনের সময় বয়সসীমা পূরণ না হওয়া সত্ত্বেও ভিন্ন জন্মতারিখের নথি ব্যবহার করে তিনি চাকরিতে নিয়োগ পান।
মাগুরা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ২০১৩ সালের ৩০ সেপ্টেম্বরের স্মারক নং ০৫.৪৪.৫৫০০.০০৮.০৯.০১৮.১৩-১৫৬১ অনুযায়ী সাতজনকে অফিস সহায়ক পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। ওই তালিকায় গৌতম কুমার বিশ্বাসের নামও রয়েছে।
অভিযোগকারীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গৌতম কুমার বিশ্বাসের জাতীয় পরিচয়পত্রে জন্মতারিখ ১২ ডিসেম্বর ১৯৭৮। অপরদিকে চাকরিতে ব্যবহৃত জন্মনিবন্ধন সনদে জন্মতারিখ ১২ ডিসেম্বর ১৯৮৫ উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ একই ব্যক্তির দুটি সরকারি নথিতে জন্মতারিখের পার্থক্য সাত বছর।
এ বিষয়ে মাগুরা জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা ফারাজী বেনজীর আহম্মেদ বলেন, “গৌতম কুমার বিশ্বাসের ভোটার আইডি কার্ড ও জন্মনিবন্ধন সনদের মধ্যে অমিল রয়েছে। ভোটার আইডির তথ্য আগে হয়েছে, পরে জন্মনিবন্ধন সনদ তৈরি করা হয়েছে।”
শুধু বয়স নয়, গৌতমের শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, চাকরির সময় অষ্টম শ্রেণি উত্তীর্ণের একটি সনদ ব্যবহার করা হয়। ওই সনদ জারিয়া সম্মিলনী নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের নামে তৈরি করা হয়েছে বলে অভিযোগকারীর দাবি।
তবে বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক সুনীল কুমার ঘোষ অভিযোগটি নাকচ করে বলেন, “গৌতম কুমার বিশ্বাস আমাদের বিদ্যালয়ের কোনো ছাত্র ছিলেন না। আমি তাকে কোনো অষ্টম শ্রেণির সনদ দিইনি। তিনি কখনো এই বিদ্যালয়ে লেখাপড়া করেননি। এ ধরনের সনদের দায় বিদ্যালয় বহন করবে না।”
অভিযোগের বিষয়ে গৌতম কুমার বিশ্বাস বলেন, “আমরা ছয় ভাই মুক্তিযোদ্ধা কোটায় চাকরি পেয়েছি। কাগজপত্রে অসঙ্গতি থাকতে পারে। আমি মাগুরা উন্মুক্ত থেকে এসএসসি পাস করেছি। কিন্তু আমার চাকরির নিয়োগে কেন অষ্টম শ্রেণির সনদ ব্যবহার হয়েছে, তা আমি জানি না।”
অভিযোগকারী বিধান কুমার বিশ্বাসের দাবি, গৌতম কুমার বিশ্বাসের চাকরির বয়স না থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন নথিতে ভিন্ন তথ্য ব্যবহার করে তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে তিনি জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগও দিয়েছেন।
লিখিত অভিযোগে বিধান কুমার বিশ্বাস আরও দাবি করেন, মৃত রমেন্দ্রনাথ বিশ্বাসের ছয় ছেলের মধ্যে একাধিক ব্যক্তি সরকারি ও আধা-সরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত রয়েছেন। একই পরিবারের একাধিক সদস্যের চাকরির বয়স নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া ২০১৩ সালের ৮ ডিসেম্বর মো. রফিকুল ইসলাম নামে এক চাকরিপ্রার্থী একই বিষয়ে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে আবেদন করেছিলেন বলেও অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। ওই আবেদনটি তৎকালীন রাজস্ব শাখায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মাধ্যমে আটকে রাখার অভিযোগও করা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে উত্থাপিত আর্থিক লেনদেনের অভিযোগের স্বাধীন কোনো প্রমাণ পাওয়া গেছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
বিধান কুমার বিশ্বাস বলেন, “অনেক যোগ্য প্রার্থী চাকরি পাননি। অথচ বয়স ও নথি নিয়ে প্রশ্ন থাকা সত্ত্বেও নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আমরা চাই নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটন হোক।”
মাগুরার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. মাহবুবুল হক বলেন, “গৌতম কুমার বিশ্বাসের বিষয়ে কিছু প্রয়োজনীয় নথি হাতে পেয়েছি। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
শালিখা উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) এম. সাব্বির হাসান বলেন, “নিয়োগটি ২০১৩ সালের। অভিযোগের বিষয়গুলো তদন্তসাপেক্ষ। প্রমাণ পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এদিকে সাংবাদিক ফারুক আহমেদ বুনাগাতী ইউনিয়ন ভূমি অফিসে তথ্য সংগ্রহের জন্য গেলে গৌতম কুমার বিশ্বাসকে অফিস থেকে বেরিয়ে যেতে দেখা যায় বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে তিনি কেন অফিস ত্যাগ করেছিলেন, সে বিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অভিযোগে ওঠা বয়স, জন্মনিবন্ধন ও শিক্ষাসনদের অসঙ্গতিগুলো যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি পরীক্ষা, বিদ্যালয়ের রেকর্ড যাচাই এবং জন্মনিবন্ধনের তথ্যের উৎস অনুসন্ধানের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।
২০১৩ সালের ওই নিয়োগের প্রায় ১৩ বছর পর নতুন করে অভিযোগ ওঠায় বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে। এখন তদন্তের মাধ্যমে সরকারি চাকরিতে নিয়োগের সময় গৌতম কুমার বিশ্বাসের ব্যবহৃত নথিগুলো প্রকৃত ও বৈধ ছিল কি না, সেটিই নির্ধারণের অপেক্ষায় রয়েছে।