October 17, 2026, 2:39 pm
এইমাত্রপাওয়াঃ

মাগুরায় অষ্টম শ্রেণির জাল সনদ ও ভুয়া জন্মনিবন্ধন দিয়ে চাকরির অভিযোগ

ফারুক আহমেদ, মাগুরা : মাগুরা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের অধীনে ২০১৩ সালে অফিস সহায়ক পদে নিয়োগ পাওয়া এক কর্মচারীর বিরুদ্ধে বয়স জালিয়াতি, ভুয়া জন্মনিবন্ধন এবং জাল অষ্টম শ্রেণির শিক্ষাসনদ ব্যবহার করে সরকারি চাকরি নেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযুক্ত গৌতম কুমার বিশ্বাস বর্তমানে মাগুরার শালিখা উপজেলার বুনাগাতী ইউনিয়ন ভূমি অফিসে কর্মরত রয়েছেন।

 

লিখিত অভিযোগে বলা হয়েছে, গৌতম কুমার বিশ্বাস নির্ধারিত বয়সসীমা অতিক্রম করার পরও ভিন্ন তথ্যসম্বলিত নথিপত্র ব্যবহার করে সরকারি চাকরি লাভ করেন। মাগুরা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৩ তারিখের স্মারক নং ০৫.৪৪.৫৫০০.০০৮.০৯.০১৮.১৩-১৫৬১ অনুযায়ী সাতজনকে অফিস সহায়ক পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। ওই তালিকায় সপ্তম প্রার্থী হিসেবে গৌতম কুমার বিশ্বাসের নাম ছিল।

 

অভিযোগকারীদের দাবি, গৌতম কুমার বিশ্বাসের জাতীয় পরিচয়পত্রে জন্মতারিখ ১২ ডিসেম্বর ১৯৭৮ উল্লেখ রয়েছে। অথচ চাকরির ক্ষেত্রে ব্যবহৃত জন্মনিবন্ধন সনদে জন্মতারিখ দেখানো হয়েছে ১২ ডিসেম্বর ১৯৮৫। অর্থাৎ একই ব্যক্তির দুটি সরকারি নথিতে জন্মতারিখে সাত বছরের ব্যবধান রয়েছে।

 

অভিযোগকারী বিধান কুমার বিশ্বাসের ভাষ্য, গৌতম কুমার বিশ্বাসের বয়স বর্তমানে ৬০ বছরের কাছাকাছি। অথচ ২০১৩ সালে সরকারি চাকরিতে প্রবেশের সময় বয়সসীমার মধ্যে দেখাতে নথিপত্রে ভিন্ন তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।

 

এ বিষয়ে মাগুরা জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা ফারাজী বেনজীর আহম্মেদ বলেন, “গৌতম কুমার বিশ্বাসের ভোটার আইডি কার্ড ও জন্মনিবন্ধন সনদের মধ্যে অমিল রয়েছে। ভোটার আইডির তথ্য আগে হয়েছে, পরে জন্মনিবন্ধন সনদ তৈরি করা হয়েছে।”

 

শুধু বয়সের তথ্য নয়, অভিযুক্তের শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, সরকারি চাকরির জন্য অষ্টম শ্রেণি উত্তীর্ণের একটি সনদ ব্যবহার করা হয়েছিল।

 

এ বিষয়ে জারিয়া সম্মিলনী নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সুনীল কুমার ঘোষ বলেন, “গৌতম কুমার বিশ্বাস আমাদের বিদ্যালয়ের কোনো ছাত্র ছিলেন না। আমি তাকে কোনো অষ্টম শ্রেণির সনদ দিইনি। তিনি কখনো এই বিদ্যালয়ে লেখাপড়া করেননি। এ ধরনের সনদের দায় বিদ্যালয় বহন করবে না।”

 

লিখিত অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, গৌতম কুমার বিশ্বাস অন্য একটি বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করলেও চাকরির সময় বয়স ও শিক্ষাগত যোগ্যতা প্রমাণে প্রশ্নবিদ্ধ অষ্টম শ্রেণির সনদ ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে। অভিযোগকারী দাবি করেছেন, এ ঘটনায় জালিয়াতির সঙ্গে অন্য কয়েকজন ব্যক্তির সম্পৃক্ততা থাকতে পারে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা এখনো কোনো তদন্তে প্রমাণিত হয়নি।

 

অভিযোগের বিষয়ে গৌতম কুমার বিশ্বাস বলেন, “আমরা ছয় ভাই মুক্তিযোদ্ধা কোটায় চাকরি পেয়েছি। কাগজপত্রে অসঙ্গতি থাকতে পারে। আমি মাগুরা উন্মুক্ত থেকে এসএসসি পাস করেছি। কিন্তু আমার চাকরির নিয়োগে কেন অষ্টম শ্রেণির সনদ ব্যবহার হয়েছে, তা আমি জানি না।”

 

লিখিত অভিযোগে মৃত রমেন্দ্রনাথ বিশ্বাসের ছয় ছেলের মধ্যে একাধিক ব্যক্তি বিভিন্ন সরকারি ও আধা-সরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করার বিষয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। অভিযোগকারী বিধান কুমার বিশ্বাস দাবি করেন, পরিবারের সদস্যদের বয়স ও চাকরিতে নিয়োগসংক্রান্ত বিষয়গুলোও তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন।

 

তিনি বলেন, “অনেক যোগ্য ও শিক্ষিত প্রার্থী চাকরি পাননি। অথচ বয়স ও নথিপত্র নিয়ে প্রশ্ন থাকা সত্ত্বেও নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আমরা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটন চাই।”

 

এ বিষয়ে মাগুরার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. মাহবুবুল হক বলেন, “গৌতম কুমার বিশ্বাসের বিষয়ে কিছু প্রয়োজনীয় নথি হাতে পেয়েছি। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”

 

শালিখা উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) এম. সাব্বির হাসান বলেন, “নিয়োগটি ২০১৩ সালের। অভিযোগের বিষয়গুলো তদন্তসাপেক্ষ। প্রমাণ পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

 

লিখিত অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, একই বিষয়ে ২০১৩ সালের ডিসেম্বর মাসেও জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে অভিযোগ দেওয়া হয়েছিল। অভিযোগকারী দাবি করেছেন, ওই অভিযোগের যথাযথ নিষ্পত্তি হয়নি এবং বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে ধামাচাপা পড়ে ছিল। তবে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণ ও অভিযোগ গোপনের যেসব অভিযোগ করা হয়েছে, সেগুলোরও স্বাধীন তদন্তের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারী।

 

প্রশাসন সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, সরকারি চাকরিতে প্রবেশের ক্ষেত্রে কেউ ভুল তথ্য, ভুয়া জন্মনিবন্ধন বা জাল শিক্ষাসনদ ব্যবহার করলে তা গুরুতর প্রশাসনিক ও ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে নিয়োগের বৈধতা, চাকরিকালীন বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুবিধাও তদন্তের আওতায় আসতে পারে।

 

প্রায় ১৩ বছর আগের এ নিয়োগকে ঘিরে নতুন করে প্রশ্ন ওঠার পর বিষয়টি নিয়ে এলাকায় ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। সরকারি নথিতে বয়সের অসঙ্গতি এবং শিক্ষাসনদ নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় নির্বাচন কমিশন, জন্মনিবন্ধন কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের সমন্বয়ে নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি জোরালো হচ্ছে।

 

এখন দেখার বিষয়, দীর্ঘদিনের এই অভিযোগের সত্যতা তদন্তে কী উঠে আসে এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কী ধরনের আইনগত ও বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।

আজকের বাংলা তারিখ

  • ১৭ই অক্টোবর, ২০২৬
  • ২রা কার্তিক, ১৪৩৩
  • ৫ই জমাদিউল-আউয়াল, ১৪৪৮
October ২০২৬
Mon Tue Wed Thu Fri Sat Sun
« Sep    
 ১২৩৪
৫৬৭৮৯১০১১
১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৮২৯৩০৩১  


Our Like Page