অনলাইন সীমান্তবাণী ডেস্ক : রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ক্ষমতাসীন বিএনপির দলীয় প্রার্থী হিসেবে দলের মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নাম চূড়ান্ত করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) দুপুরে সচিবালয়ে জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের পর বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার প্রার্থিতা চূড়ান্ত করেন। পরে বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠক শেষে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আনুষ্ঠানিকভাবে এ ঘোষণা দেন।
বিকেলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে মির্জা ফখরুলের পক্ষে নির্বাচন কমিশনে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া হয়। এতে প্রস্তাবকারী হিসেবে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান এবং সমর্থনকারী হিসেবে স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় স্বাক্ষর করেন।
আগামী ২০ আগস্ট রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। একই নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্যের পক্ষ থেকে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদকে প্রার্থী করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার তার মনোনয়নপত্রও জমা দেওয়া হয়েছে।
শেষ পর্যন্ত কোনো প্রার্থী মনোনয়ন প্রত্যাহার না করলে প্রায় ৩৫ বছর পর রাষ্ট্রপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক ভোট অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এর আগে ১৯৯১ সালে রাষ্ট্রপতি পদে ভোট হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন।
সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি সংসদ সদস্যদের ভোটে নির্বাচিত হন। বর্তমানে জাতীয় সংসদে বিএনপির দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় মির্জা ফখরুলের নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। নির্বাচিত হলে তিনি বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হবেন।
শিক্ষকতা থেকে রাজনীতি, রাজপথ পেরিয়ে বঙ্গভবনের পথে
১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁও জেলায় জন্মগ্রহণ করেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। রাজনৈতিক সচেতন পরিবারে বেড়ে ওঠা মির্জা ফখরুল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিষয়ে পড়াশোনা শেষে শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেন। পরে আশির দশকে বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে শিক্ষকতা ছেড়ে সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন।
১৯৯২ সালে তিনি বিএনপির ঠাকুরগাঁও জেলা সভাপতি নির্বাচিত হন। ২০০৯ সালে দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব এবং ২০১৬ সালে বিএনপির মহাসচিবের দায়িত্ব পান। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি দলের নানা সংকট ও আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
২০০১ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে প্রথমে কৃষি প্রতিমন্ত্রী এবং পরে বেসামরিক বিমান ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে ২০১৮ সালে বগুড়া-৬ আসন থেকেও সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সর্বশেষ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রীর দায়িত্ব পান।
বিএনপির দীর্ঘ রাজনৈতিক সংকটের সময়ে দলের মহাসচিব হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন মির্জা ফখরুল। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে তিনি একাধিকবার গ্রেপ্তার ও কারাবরণ করেন। ২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবর বিএনপির ঢাকা মহাসমাবেশকে কেন্দ্র করেও তাকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং একাধিক মামলায় আসামি করা হয়।
দীর্ঘ চার দশকের রাজনৈতিক পথচলায় আন্দোলন-সংগ্রাম, সাংগঠনিক নেতৃত্ব এবং দলীয় সংকট মোকাবিলায় ভূমিকার কারণে বিএনপির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নেতায় পরিণত হয়েছেন মির্জা ফখরুল। শিক্ষকতার শ্রেণিকক্ষ থেকে রাজপথ, সংসদ ও মন্ত্রিসভা পেরিয়ে এবার দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ রাষ্ট্রপতির প্রার্থী হয়েছেন তিনি।
এদিকে গত ২৪ জুলাই রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেন আওয়ামী লীগের মনোনয়নে নির্বাচিত মো. সাহাবুদ্দিন। এরপর স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করছেন। সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ২০ আগস্টের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের অভিষেক ঘটতে পারে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে শিক্ষকতা থেকে রাজনীতি, রাজপথের আন্দোলন থেকে সংসদ ও মন্ত্রিসভা হয়ে বঙ্গভবনের পথে তার এই যাত্রা নিঃসন্দেহে একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায় হয়ে থাকবে।