অনলাইন সীমান্তবাণী ডেস্ক : ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে আবুধাবিতে অনুষ্ঠিত আলোচনায় বিশ্বের শীর্ষ দুই পারমাণবিক শক্তি রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র উচ্চপর্যায়ের সামরিক যোগাযোগ পুনরায় শুরু করতে সম্মত হয়েছে। দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণের আগে মস্কো ও ওয়াশিংটনের মধ্যে জ্যেষ্ঠ সামরিক সংলাপ স্থগিত করা হয়েছিল। সে সময় তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন রাশিয়ার সঙ্গে প্রায় সব ধরনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করেন।
তবে গত বছর হোয়াইট হাউসে ফিরে আসার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মস্কোর সঙ্গে যোগাযোগ পুনরুদ্ধার করেন এবং রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে একাধিক বৈঠক ও একটি শীর্ষ সম্মেলন করেন।
আকুধাবি থেকে এএফপি জানায়, ইউক্রেন যুদ্ধের অবসান ঘটাতে সম্ভাব্য সমঝোতার খোঁজে আবুধাবিতে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও ইউক্রেনের প্রতিনিধিদের দুই দিনের আলোচনার পর সামরিক যোগাযোগ পুনরুদ্ধারের এ সিদ্ধান্ত আসে।
আলোচনার ফলে চার মাসের মধ্যে প্রথমবারের মতো বন্দি বিনিময় হয়েছে। তবে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি আলোচনা ‘জটিল’ বলে উল্লেখ করে দ্রুত অগ্রগতির আহ্বান জানিয়েছেন।
কিয়েভের প্রধান আলোচক পরে জানান, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে আলোচনা অব্যাহত থাকবে।
মস্কো ও ওয়াশিংটনের মধ্যে সর্বশেষ পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তি নিউ স্টার্টের মেয়াদ শেষ হওয়ার কয়েক ঘণ্টা পরই এ ঘোষণা আসে, যা বৈশ্বিক অস্ত্র প্রতিযোগিতা শুরু হওয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে।
মার্কিন সামরিক বাহিনীর ইউরোপীয় কমান্ড এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ‘যুক্তরাষ্ট্র ও রুশ ফেডারেশন আজ আবুধাবিতে উচ্চপর্যায়ের সামরিক-সামরিক সংলাপ পুনঃস্থাপনে সম্মত হয়েছে।’ একই সঙ্গে বলা হয়, ‘দুই পক্ষ স্থায়ী শান্তির লক্ষ্যে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।’
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, সামরিক বাহিনীগুলোর মধ্যে সংলাপ বজায় রাখা বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা ও শান্তির জন্য গুরুত্বপূর্ণ এবং এর মাধ্যমে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি ও উত্তেজনা প্রশমনের সুযোগ তৈরি হয়।
এ বিষয়ে মস্কোর পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
আবুধাবির আলোচনায় মস্কো ও কিয়েভ ৩০০ জনের বেশি বন্দি বিনিময়ে সম্মত হলেও ভূখণ্ড ইস্যুতে তেমন অগ্রগতির কোনো লক্ষণ দেখা যায়নি।
জেলেনস্কি বলেন, ‘এটি অবশ্যই সহজ নয়, তবে ইউক্রেন গঠনমূলক অবস্থান বজায় রেখেছে এবং রাখবে।’
কিয়েভের প্রধান আলোচক রুস্তেম উমেরভ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানান, প্রতিনিধিদলগুলো নিজ নিজ রাজধানীকে অবহিত করবে এবং আগামী সপ্তাহগুলোতে ত্রিপক্ষীয় আলোচনা অব্যাহত রাখবে।
মার্কিন মধ্যস্থতাকারী স্টিভ উইটকফ স্বীকার করেছেন, সামনে এখনও ‘গুরুত্বপূর্ণ’ কাজ বাকি রয়েছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের সবচেয়ে প্রাণঘাতী সংঘাত হিসেবে বিবেচিত এ যুদ্ধে লাখ লাখ মানুষ নিহত হয়েছে, কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে এবং ইউক্রেনের পূর্ব ও দক্ষিণাঞ্চলের বড় অংশ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। সংঘাত বন্ধে কূটনৈতিক প্রচেষ্টার ধারাবাহিকতায় এ আলোচনা সর্বশেষ উদ্যোগ।
আলোচনা চলাকালে শূন্যের নিচে তাপমাত্রার মধ্যে ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভের বড় অংশ এখনও তাপ সরবরাহবিহীন ছিল। ধারাবাহিক রুশ হামলায় শত শত আবাসিক ভবনের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
কিয়েভের মেয়র ভিটালি ক্লিচকো সতর্ক করে বলেন, চলতি সপ্তাহের শুরুতে এক গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎকেন্দ্র ধ্বংস হওয়ায় এক হাজারের বেশি অ্যাপার্টমেন্ট ভবন দুই মাস পর্যন্ত তাপ সরবরাহ থেকে বঞ্চিত থাকতে পারে।
আলোচনার প্রধান জটিলতা পূর্ব ইউক্রেনের ভূখণ্ডের ভবিষ্যৎ নিয়ে।
মস্কো যেকোনো সমঝোতার আগে প্রাকৃতিক সম্পদসমৃদ্ধ ও শক্তভাবে সুরক্ষিত ডনবাস অঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা থেকে ইউক্রেনীয় সেনা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে। একই সঙ্গে আগ্রাসনের মাধ্যমে দখল করা ভূখণ্ডকে রাশিয়ার অংশ হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি চায়।
অন্যদিকে কিয়েভ বর্তমান যুদ্ধরেখা বরাবর সংঘাত স্থগিত করার প্রস্তাব দিয়েছে এবং সেনা প্রত্যাহারের দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে।
ফরাসি টেলিভিশনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জেলেনস্কি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং ‘পুতিন কেবল ট্রাম্পকেই ভয় পান।’
এক বিরল স্বীকারোক্তিতে জেলেনস্কি জানান, ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রুশ আগ্রাসনের পর থেকে অন্তত ৫৫ হাজার ইউক্রেনীয় সেনা নিহত হয়েছেন, যা অনেক স্বাধীন হিসাবের তুলনায় কম।
রাশিয়া তাদের নিহত সেনার সংখ্যা প্রকাশ করেনি। তবে বিবিসি ও স্বাধীন সংবাদমাধ্যম মিডিয়াজোনার শোকবার্তা ও পারিবারিক ঘোষণার অনুসন্ধানে সংঘাতে নিহত ১ লাখ ৬০ হাজারের বেশি রুশ সেনার নাম পাওয়া গেছে।
বর্তমানে ইউক্রেনের প্রায় ২০ শতাংশ এলাকা রাশিয়ার দখলে রয়েছে। মস্কো দোনেৎস্ক, লুহানস্ক, খেরসন ও জাপোরিঝঝিয়া অঞ্চল নিজেদের অংশ বলে দাবি করছে এবং পূর্বাঞ্চলের অন্তত আরও তিনটি অঞ্চলের কিছু অংশ নিয়ন্ত্রণে রেখেছে।
মস্কোর দাবি করা দোনেৎস্ক অঞ্চলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এখনও কিয়েভের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ইউক্রেন সতর্ক করেছে, ভূখণ্ড ছেড়ে দিলে রাশিয়া আরও উৎসাহিত হবে এবং ভবিষ্যতে নতুন আগ্রাসন ঠেকাতে ব্যর্থ এমন কোনো চুক্তিতে তারা সই করবে না।