ফারুক আহমেদ, মাগুরা : ব্রিটিশ আমলে ১৯১৪ সালে প্রতিষ্ঠিত মাগুরা সদর উপজেলার হাজীপুর ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী হাজীপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে কম্পিউটার ল্যাব অপারেটর নিয়োগসহ বিভিন্ন বিষয়ে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের বিষয়গুলো নিয়ে সরেজমিনে বিদ্যালয়ে গিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে নানা তথ্য।
বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) দুপুর ১২টার দিকে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আশরাফুল ইসলামের সঙ্গে কথা হলে তিনি কম্পিউটার ল্যাব, ল্যাব অপারেটর নিয়োগসহ বিভিন্ন বিষয়ে সাংবাদিকদের কাছে তথ্য তুলে ধরেন।
বিদ্যালয়ের আইসিটি সহকারী শিক্ষক আমিরুল ইসলাম জানান, বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের (বিসিসি) মাধ্যমে ২০০৫ সালে বিদ্যালয়ে পাঁচটি ডেস্কটপ কম্পিউটার দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে বর্তমান প্রধান শিক্ষক যোগদানের আগেই ওই কম্পিউটারগুলো নষ্ট হয়ে যায়।
বিদ্যালয়ের বর্তমান প্রধান শিক্ষক মো. আশরাফুল ইসলাম ২০১৫ সালের ১৫ মার্চ বিদ্যালয়ে যোগদান করেন। এরপর ২০১৭ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রকল্প পরিচালকের কার্যালয় থেকে বিদ্যালয়ে ‘শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাব’ স্থাপন করা হয়। এ সময় একটি ল্যাপটপ, ১০টি ডেস্কটপ কম্পিউটার, একটি লেজার প্রিন্টার, একটি স্ক্যানার, একটি মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর ও স্ক্রিন, একটি ট্যাব, একটি থ্রিজি রাউটার, ১০টি ডাবল কম্পিউটার টেবিল, ৩১টি চেয়ার এবং একটি ইন্সট্রাক্টর টেবিল দেওয়া হয়।
এ ছাড়া প্রকল্পের আওতায় ল্যাবকক্ষ সংস্কারের জন্য ২০ হাজার টাকা এবং সাইনবোর্ড স্থাপনের জন্য ১০ হাজার টাকা বরাদ্দের কথা উল্লেখ করা হয়।
বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের আগ পর্যন্ত ল্যাবে ২০ জন করে শিক্ষার্থীর ব্যাচ তৈরি করে প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। তবে করোনার পর ল্যাবের অধিকাংশ কম্পিউটার নষ্ট হয়ে যায়। পরে বিদ্যালয়ের অর্থায়নে প্রধান শিক্ষক পাঁচটি ডেস্কটপ কম্পিউটার মেরামত করেন। সেগুলোও পরবর্তীতে নষ্ট হয়ে বর্তমানে দুটি কম্পিউটার সচল রয়েছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
নিয়োগ নিয়ে প্রধান শিক্ষকের বক্তব্য
কম্পিউটার ল্যাব অপারেটর নিয়োগের বিষয়ে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আশরাফুল ইসলাম বলেন, ২০২২ সালের ৯ জুলাই অনুষ্ঠিত নিয়োগ পরীক্ষায় প্রথম হয়ে চিরনজিত মন্ডল কম্পিউটার ল্যাব অপারেটর পদে নিয়োগ পান এবং চাকরিতে যোগদান করেন।
প্রধান শিক্ষকের দাবি, চিরনজিত মন্ডল এসএসসি ও এইচএসসি বিজ্ঞান বিভাগ থেকে উত্তীর্ণ হওয়ার পাশাপাশি রসায়ন বিষয়ে অনার্স ও মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেছেন। ২০১৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষার মার্কশিটে তার তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ও ছিল। পাশাপাশি তিনি সরকার অনুমোদিত প্রতিষ্ঠান থেকে ছয় মাস মেয়াদি কম্পিউটার ডিপ্লোমা সম্পন্ন করেছেন।
প্রধান শিক্ষক আরও দাবি করেন, বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের (স্কুল ও কলেজ) জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা অনুযায়ী কম্পিউটার ল্যাব অপারেটর পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে বিজ্ঞান বিভাগে কম্পিউটার বা তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়সহ এইচএসসি পাসের যোগ্যতা প্রয়োজন। নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি জাতীয় দৈনিক সমকাল ও আঞ্চলিক দৈনিক গ্রামের কাগজে প্রকাশ করা হয়েছিল।
তার ভাষ্য, সরকারি বিধিমোতাবেক বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটির মাধ্যমে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। নিয়োগে অর্থ লেনদেনের অভিযোগকে তিনি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত রটনা বলে দাবি করেন।
ফলাফলেও সাফল্যের দাবি
বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানায়, ২০২৬ সালে কারিগরি-কম্পিউটার ট্রেডের শিক্ষার্থীদের সকাল সাড়ে ৯টা থেকে সাড়ে ১০টা পর্যন্ত প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। চলতি বছর এসএসসি ভোকেশনাল শাখায় বিদ্যালয়ের পাসের হার ৮৩ দশমিক ৩৪ শতাংশ, যা মাগুরা সদর উপজেলায় প্রথম স্থান অর্জন করেছে বলে দাবি করা হয়। একই সময়ে জেনারেল শাখায় পাসের হার ৬৭ দশমিক ৩০ শতাংশ, যা বোর্ডের পাসের হারের চেয়ে বেশি বলে জানান বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
ঐতিহ্যবাহী এ বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে
বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ১৯১৪ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে দীর্ঘ ১১২ বছরে এ প্রতিষ্ঠান থেকে পড়াশোনা করে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন অনেক শিক্ষার্থী। তাদের মধ্যে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাবেক সিনিয়র সচিব আকরাম আল হোসেন, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সাবেক অতিরিক্ত সচিব এনায়েত হোসেন, বিদ্যালয়ের বর্তমান সভাপতি ও বিজ্ঞানী দিদার ইসলাম, খাদ্য অধিদপ্তরের যুগ্ম সচিব কামার জাহান, ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সাবেক যুগ্ম সচিব মনজির আহমেদ এবং বর্তমানে নড়াইল জেলার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক ও নড়াইল পৌরসভার প্রশাসক সুদীপ্ত সিংহ রয়েছেন বলে দাবি করা হয়।
এ ছাড়া ঢাকা মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী ও চিকিৎসক ডা. আফরোজা বেগম পলি, ডা. সেলিনা বেগম, ডা. শাহানাজ সুলতানাসহ বিভিন্ন পেশায় প্রতিষ্ঠিত আরও অনেক সাবেক শিক্ষার্থী রয়েছেন বলে বিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে।
তবে কম্পিউটার ল্যাব অপারেটর নিয়োগসহ বিভিন্ন বিষয়ে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ও নথিপত্র যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না—এখন সেটিই দেখার বিষয়। অভিযোগগুলোর স্বাধীনভাবে যাচাই ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনা করা হলে প্রকৃত চিত্র আরও স্পষ্ট হবে।