ফারুক আহমেদ, মাগুরা : মাগুরার শ্রীপুরে প্রায় এক যুগ পর পাওনা ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা আদায়কে কেন্দ্র করে পঞ্চানন মন্ডলের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেছেন বীর মুক্তিযোদ্ধা বিনোদ কুমার বিশ্বাস। একই সঙ্গে মামলার তিন সাক্ষীর জবানবন্দি ভুল তথ্য দিয়ে একই ধরনের করে লিপিবদ্ধ করার অভিযোগ উঠেছে তদন্তকারী পুলিশের উপপরিদর্শকের বিরুদ্ধে।
মামলার নথি সূত্রে জানা যায়, শ্রীপুরের করুন্দি গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা বিনোদ কুমার বিশ্বাস (৬৮) বাদী হয়ে পঞ্চানন মন্ডলের বিরুদ্ধে মাগুরার বিজ্ঞ শ্রীপুর আমলী আদালতে সিআর মামলা নং-১৪৯/২০২৬ দায়ের করেন। মামলায় দণ্ডবিধির ৪০৬, ৪০৭, ৪২০ ও ৫০৬(২) ধারার অভিযোগ আনা হয়েছে। মামলার বাদীপক্ষে আইনজীবী হিসেবে রয়েছেন অ্যাডভোকেট মো. মিজানুর রহমান মিজান।
মামলার অভিযোগে বলা হয়, আসামি পঞ্চানন মন্ডল ২০১৫ সালে বাদী বিনোদ কুমার বিশ্বাসের পাট ও ভূষিমাল ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ব্যবস্থাপক হিসেবে যোগদান করেন। চাকরিরত অবস্থায় প্রতিষ্ঠানের অর্থ ও সম্পদের কোনো ধরনের ক্ষতি হলে তা পূরণের শর্ত ছিল বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।
বাদীর দাবি, চাকরির সময় বিভিন্নভাবে প্রতিষ্ঠানের ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা আত্মসাৎ করা হয়, যার হিসাব প্রতিষ্ঠানের রেজিস্টার খাতায় রয়েছে। পরে হিসাব চাইলে আসামি ভারতে চিকিৎসার জন্য যাওয়ার কথা বলে প্রতিষ্ঠান থেকে চলে যান। পরবর্তীতে হিসাব করে ওই টাকা পাওনা রয়েছে বলে বাদী জানতে পারেন।
মামলার অভিযোগে আরও বলা হয়, পাওনা টাকা পরিশোধের জন্য বারবার তাগাদা দিলেও আসামি সময়ক্ষেপণ করতে থাকেন। সর্বশেষ ৬ এপ্রিল ২০২৬ সকাল ১১টার দিকে বাদী কয়েকজন সাক্ষীকে সঙ্গে নিয়ে আসামির বাড়িতে গিয়ে টাকা দাবি করেন। এ সময় আসামি টাকা নেওয়ার কথা স্বীকার করলেও তা পরিশোধ করতে পারবেন না বলে জানান এবং আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেন। পাশাপাশি ভয়ভীতি ও হুমকি দিয়ে তাদের বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে।
বাদীপক্ষের অভিযোগ, স্থানীয়ভাবে একাধিকবার সালিশ-মীমাংসার চেষ্টা করা হলেও আসামি উপস্থিত না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত আদালতের আশ্রয় নিতে বাধ্য হন তিনি।
এদিকে মামলার তদন্তকালে সাক্ষী মো. জাহাঙ্গীর শিকদার, সুকদেব মন্ডল ও বাবলু সরদারের জবানবন্দি নেওয়া হয়। বাদীর অভিযোগ, তিন সাক্ষীর জবানবন্দিতে ভুল তথ্য দেওয়া হয়েছে এবং বক্তব্যগুলো একই ধরনের ভাষায় লিপিবদ্ধ করা হয়েছে।
মামলার নথিতে থাকা সাক্ষী বাবলু সরদারের ১৩ এপ্রিল ২০২৬ তারিখের ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬১ ধারার জবানবন্দিতে বলা হয়েছে, তিনি বাদী ও আসামি উভয়কে পূর্বপরিচিত হিসেবে জানেন। তিনি আগে টিকারবিলা বাজারে ব্যবসা করতেন এবং বর্তমানে সিএনজি চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন।
জবানবন্দিতে বাবলু সরদার বলেন, পঞ্চানন মন্ডল ২০১৫ সালে বাদীর প্রতিষ্ঠানে ব্যবস্থাপক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। প্রায় তিন বছর পর আসামির স্ত্রী অসুস্থ হলে তিনি চাকরি ছেড়ে স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য ভারতে যান। পরে বাদীর আহ্বানে টিকারবিলা বাজার কমিটির উদ্যোগে একাধিক সালিশ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় এবং তিনি সেসব বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে জবানবন্দিতে বাবলু সরদার উল্লেখ করেন, তিনি ৬ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বাদী ও আসামির বাড়িতে গিয়ে টাকা চাওয়ার ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী নন। তিনি আরও বলেন, বাদী ও আসামির মধ্যে টাকা লেনদেনের প্রকৃত ঘটনাও তিনি নিজ চোখে দেখেননি এবং পঞ্চানন মন্ডল প্রতিষ্ঠানে কর্মরত থাকা অবস্থায় কোনো টাকা-পয়সা বা মালামাল আত্মসাৎ কিংবা তছরুপ করেছিলেন কি না, সে বিষয়েও তার ব্যক্তিগতভাবে কোনো জানা নেই।
জবানবন্দি লিপিবদ্ধ করেন মোল্লা রফিকুল ইসলাম, বিপি-৭৫১৬০৭৮২৫৯, সাব-ইন্সপেক্টর (নিরস্ত্র), শ্রীপুর থানা, মাগুরা।
বাদী বিনোদ কুমার বিশ্বাসের অভিযোগ, তিন সাক্ষীর বক্তব্য আলাদাভাবে নেওয়া হলেও জবানবন্দিগুলোতে একই ধরনের ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে এবং কিছু তথ্য বাস্তব ঘটনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এ বিষয়ে তিনি সুষ্ঠু তদন্ত ও আদালতের মাধ্যমে ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করেছেন।
অন্যদিকে, মামলার অভিযোগ ও সাক্ষীদের জবানবন্দিতে উত্থাপিত বিষয়গুলো আদালতে বিচারাধীন। অভিযোগগুলোর সত্যতা প্রমাণের বিষয়টি সাক্ষ্য-প্রমাণ ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।