অনলাইন সীমান্তবাণী ডেস্ক : কুমিল্লার লালমাইয়ে ধানক্ষেত থেকে সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী জান্নাতুল তাজমিনের (১৫) মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত সুমনকে চট্টগ্রাম থেকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। শুক্রবার (৯ অক্টোবর) কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তবে হত্যাকাণ্ডের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলামত নিহতের ব্যবহৃত মুঠোফোনটি এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। এ ঘটনায় আর কারা জড়িত এবং কী কারণে তাজমিনকে হত্যা করা হয়েছে, তা জানতে অভিযুক্তকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে পুলিশ।
নিহত জান্নাতুল তাজমিন যশোর সদর উপজেলার চুড়ামনকাটি ইউনিয়নের ছাতিয়ানতলা গ্রামের আব্দুল আলীমের মেয়ে। তিনি কুমিল্লা নগরীর ফরিদা বিদ্যায়তনের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিলেন। তাঁর বাবা ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান রেনেটায় চাকরি করার সুবাদে পরিবারের সঙ্গে কুমিল্লা নগরীর রেসকোর্স এলাকায় ভাড়া বাসায় বসবাস করতেন।
পুলিশ ও পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, গত ৪ অক্টোবর বান্ধবীর বাড়িতে যাওয়ার কথা বলে বাসা থেকে বের হয় তাজমিন। পরে সে ব্রাহ্মণবাড়িয়া হয়ে কক্সবাজারে যায়। ৭ অক্টোবর সেখান থেকে কুমিল্লার উদ্দেশে বাসে রওনা দেয়। ওই দিন গভীর রাতে কুমিল্লার পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড এলাকায় নূরজাহান হোটেলের সামনে বাস থেকে নামতে দেখা যায় তাকে। হাইওয়ের সিসিটিভি ফুটেজে রাত পৌনে ১২টার দিকে তার নামা এবং আশপাশের দোকানে অবস্থানের দৃশ্য পাওয়া গেছে।
ফুটেজে দেখা যায়, তাজমিন একটি দোকানির সঙ্গে কথা বলে এবং মুঠোফোনে কিছু একটা দেখায়। পরে রাত সোয়া ১২টার দিকে তাকে হোটেল এলাকা ছেড়ে যেতে দেখা যায়। এরপর কীভাবে এবং কার সঙ্গে সে লালমাই উপজেলার জগতপুর গ্রামের নির্জন ফসলি মাঠে পৌঁছায়, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তদন্তকারীরা সিসিটিভি ফুটেজসহ বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ করছেন।
বাবার কাছে পাঠিয়েছিল শেষ বার্তা
তাজমিনের মৃত্যুর আগে বাবার কাছে পাঠানো একটি বার্তা ও লাইভ লোকেশন ঘটনাটিকে আরও হৃদয়বিদারক করে তুলেছে। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, বুধবার গভীর রাতে আনুমানিক পৌনে ২টার দিকে বাবার মুঠোফোনে বার্তা ও নিজের অবস্থান পাঠিয়ে তাকে দ্রুত নিয়ে যাওয়ার অনুরোধ করে তাজমিন। কিন্তু ঘুমিয়ে থাকায় বাবা তাৎক্ষণিকভাবে বার্তাটি দেখতে পারেননি।
সকালে মুঠোফোনে বার্তাটি দেখে লোকেশন অনুসরণ করে ঘটনাস্থলে পৌঁছান আব্দুল আলীম। সেখানে মেয়ের মরদেহ উদ্ধারের খবর পেয়ে তিনি শোকাহত হয়ে পড়েন। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই বার্তা ও লোকেশন হত্যাকাণ্ডের সময়কার ঘটনাপ্রবাহ অনুসন্ধানে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হতে পারে।
ধানক্ষেতে ধস্তাধস্তির চিহ্ন, পাশে পরিত্যক্ত অটোরিকশা
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সকাল ৮টার দিকে লালমাই উপজেলার পেরুল উত্তর ইউনিয়নের জগতপুর উত্তরপাড়ার মানুমুড়া জঙ্গলসংলগ্ন একটি ফসলি জমি থেকে তাজমিনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ঘটনাস্থলের আশপাশের চার থেকে পাঁচটি ধানক্ষেতে ধানগাছ দুমড়েমুচড়ে থাকা এবং দৌড়াদৌড়ি ও ধস্তাধস্তির আলামত পাওয়া যায়।
মরদেহের কিছু দূরে একটি ভ্যানিটি ব্যাগ এবং পাশে একটি পরিত্যক্ত সিএনজিচালিত অটোরিকশা পড়ে ছিল। স্থানীয়রা বিষয়টি পুলিশকে জানালে মরদেহ ও অটোরিকশাটি উদ্ধার করা হয়। তাজমিনের গলায় গামছা প্যাঁচানো ছিল। পুলিশ প্রাথমিকভাবে শ্বাসরোধে হত্যার ধারণা করলেও মৃত্যুর সঠিক কারণ ও অন্য কোনো নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছিল কি না, তা ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন থেকে নিশ্চিত হওয়ার কথা জানিয়েছে।
কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান জানান, প্রযুক্তির সহায়তা ও বিভিন্ন সূত্র ধরে অভিযান চালিয়ে প্রধান অভিযুক্ত সুমনকে চট্টগ্রাম থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডে অন্য কেউ জড়িত ছিল কি না, কী উদ্দেশ্যে ঘটনাটি ঘটানো হয়েছে এবং তাজমিনের মুঠোফোন কোথায় রয়েছে—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনে পুলিশের একাধিক দল কাজ করছে।
এ ঘটনায় নিহতের বাবা আব্দুল আলীম বাদী হয়ে লালমাই থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করেন। ময়নাতদন্ত শেষে বৃহস্পতিবার রাতে স্বজনরা তাজমিনের মরদেহ যশোরের গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যান। পরে ছাতিয়ানতলা গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
একটি কিশোরীর এমন মর্মান্তিক মৃত্যুতে পরিবার ও এলাকাজুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। এখন তদন্তের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত ঘটনা, জড়িত অন্য ব্যক্তিদের পরিচয় এবং তাজমিনের শেষ মুহূর্তে কী ঘটেছিল, তা উদ্ঘাটনের অপেক্ষায় স্বজন ও এলাকাবাসী।