ফারুক আহমেদ, মাগুরা জেলা প্রতিনিধি : মাগুরা সদর উপজেলার প্রফুল্ল সিংহ আয়ুর্বেদিক মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ ও কয়েকজন শিক্ষক-কর্মচারীর বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম, শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়, নিয়মিত কলেজ না খোলা, পরীক্ষায় নকলের সুযোগ দেওয়াসহ বিভিন্ন অভিযোগ উঠেছে। এসব অনিয়মের কারণে খুলনা বিভাগের একমাত্র এ আয়ুর্বেদিক মেডিকেল কলেজটির ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
অভিযোগ রয়েছে, সরকারি ছুটির দিন ও সাপ্তাহিক ছুটি ছাড়া নিয়মিত কলেজ খোলা থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে নিয়মিতভাবে কলেজের কার্যক্রম পরিচালিত হয় না। পরীক্ষার সময় ও ফরম পূরণের সময় কলেজ খোলা হয় বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। ফরম পূরণসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নির্ধারিত অর্থের বাইরে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা নেওয়ারও অভিযোগ রয়েছে।
ঝিনাইদহ সদর উপজেলার ফুরসন্ধি ইউনিয়নের বামনআইল গ্রামের কানাই বিশ্বাস অভিযোগ করে বলেন, ২০১৯ বা ২০২০ সালে ভর্তির সময় প্রভাষক মোহিত কুমার সাহা তার কাছ থেকে ৫ হাজার টাকা নেন। পরীক্ষার ফরম পূরণের সময় ৩ হাজার ২০০ থেকে ৩ হাজার ৩০০ টাকা এবং প্রতি বছর ভর্তির সময় ২ হাজার ৪০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা নেওয়া হয়েছে। এসব অর্থের কোনো রসিদ তাকে দেওয়া হয়নি বলেও দাবি করেন তিনি। তার আত্মীয় অরুপ মজুমদারের কাছ থেকেও বিভিন্ন সময়ে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ করেন কানাই বিশ্বাস।
মাগুরা পুলিশ লাইনপাড়া এলাকার খিজির হাসানের অভিযোগ, তিনি ২০২২ সালে ডিএএমএস পাস করলেও এখনো ইন্টার্নশিপের সনদপত্র পাননি। সনদ দেওয়ার ক্ষেত্রে তার কাছে অতিরিক্ত অর্থ দাবি করা হয়েছে এবং বিভিন্ন সামগ্রী কেনার কথা বলা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
এদিকে কলেজের ব্যবস্থাপনা কমিটি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে একই কমিটি দায়িত্ব পালন করছে, যদিও কমিটির মেয়াদ তিন বছর। এছাড়া কলেজের ৭১ শতক জমির বর্গা ফসলের অর্থ কলেজের তহবিলে যথাযথভাবে জমা দেওয়া হয় না বলেও অভিযোগ রয়েছে।
আরও অভিযোগ রয়েছে, শিক্ষার্থীদের ফরম পূরণের টাকা বোর্ডে পাঠানোর আগে কয়েক মাস কলেজ কর্তৃপক্ষের কাছে রাখা হয় এবং পরীক্ষার পর অর্থ জমা দেওয়া হয়। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে কলেজ কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অভিযোগকারীদের আরও দাবি, ডিএএমএস পাস করার পর অনেক শিক্ষার্থী ইন্টার্নশিপের সনদপত্র না পাওয়ায় সমস্যায় পড়েছেন। মাগুরা, ঝিনাইদহসহ বিভিন্ন জেলার একাধিক শিক্ষার্থী এ সমস্যার শিকার হয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে।
এছাড়া শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগ নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। ২০২২ সালে শিক্ষক ও কর্মচারী নিয়োগের জন্য কয়েকজন আবেদন করলেও নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়নি বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন। তাদের অভিযোগ, বর্তমানে কর্মরত কয়েকজন শিক্ষক-কর্মচারীর নিয়োগ প্রক্রিয়াও প্রশ্নবিদ্ধ।
পরীক্ষা ব্যবস্থাপনা নিয়েও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, বোর্ডের বার্ষিক কোয়ালিফাইং পরীক্ষায় চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থীদের একটি অংশ হলসুপার ও শিক্ষকদের সহযোগিতায় বই ও ফটোকপি দেখে পরীক্ষা দেয়। পরীক্ষার সময় দায়িত্বপ্রাপ্ত ম্যাজিস্ট্রেটের তিন ঘণ্টা পরীক্ষার হলে থাকার কথা থাকলেও অনেক সময় তিনি মাত্র কয়েক মিনিট থাকেন কিংবা পরীক্ষাকেন্দ্রে উপস্থিত থাকেন না বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
গত ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ দুপুর ১২টার দিকে মাগুরা সাংবাদিক ইউনিয়নের সহ-সভাপতি সাহেব আলী সরেজমিনে কলেজে গিয়ে বারান্দায় তালা ও কলেজ বন্ধ দেখতে পান বলে জানা গেছে।
অন্যদিকে, অধ্যক্ষ বাবুল হোসেন ও প্রভাষক মোহিত কুমার সাহার বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অবৈধভাবে অর্থ আদায়ের অভিযোগের কিছু নথি ও তথ্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে বলে অভিযোগকারীরা জানিয়েছেন। এ বিষয়ে আরও ভিডিও ও অডিও রেকর্ড রয়েছে বলেও তারা দাবি করেছেন।
অভিযোগ রয়েছে, কলেজের অধ্যক্ষ বাবুল হোসেন দীর্ঘ প্রায় ১২ বছর ধরে দায়িত্ব পালন করছেন। এ সময় শিক্ষার্থীদের বৃত্তি ও ইন্টার্নশিপ বৃত্তির অর্থ যথাযথভাবে দেওয়া হয়নি বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। প্রায় তিন বছর আগে তৎকালীন মাগুরা জেলা প্রশাসক ও কলেজের সভাপতি আবু নাসের বেগ ইন্টার্নশিপ বৃত্তি দেওয়ার নির্দেশ দিলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি বলে অভিযোগকারীদের দাবি।
এছাড়া প্রভাষক সৈয়দ মেহেদী আক্তার খোকা, প্রভাষক মোহিত কুমার সাহা এবং একজন পিয়নের বয়স ৬০ বছরের বেশি হলেও তারা এখনো দায়িত্ব পালন করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে কলেজের অধ্যক্ষ বাবুল হোসেনের সঙ্গে সাংবাদিকরা একাধিকবার সরাসরি ও মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
কলেজের সভাপতি ও মাগুরা জেলা প্রশাসক মোতাকাব্বীর আহমেদ বলেন, প্রফুল্ল সিংহ আয়ুর্বেদিক মেডিকেল কলেজের সভাপতি হিসেবে বিষয়টি তিনি কয়েক দিন আগে জানতে পেরেছেন। তিনি সাংবাদিক ফারুক আহমেদকে লিখিত অভিযোগ দিতে বলেছেন এবং অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। এছাড়া পরীক্ষার সময় তিন ঘণ্টা পরীক্ষার হলরুমে ম্যাজিস্ট্রেট রাখার ব্যবস্থা করা হবে বলেও তিনি জানান।
এদিকে বাংলাদেশ বোর্ড অব ইউনানি ও আয়ুর্বেদিক সিস্টেম অব মেডিসিনের চেয়ারম্যান মল্লিকা খাতুন, রেজিস্ট্রার মো. মিজানুর রহমান, বোর্ডের কন্ট্রোলার রুহুল আমীন, ডিজি হেলথ হাসান, বোর্ড সদস্য আব্দুর রহমান ও সদস্য আলমগীরের কাছে অভিযোগের কয়েকটি নথি পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে।
অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী ও সচেতন মহল।