ফারুক আহমেদ, মাগুরা : মাগুরা সদর উপজেলার শত্রুজিৎপুর ইউনিয়নের শত্রুজিৎপুর বাজারে অবস্থিত শত্রুজিৎপুর ল্যাব মেডিকেল ডায়াগনস্টিক সেন্টারে রোগীকে চিকিৎসা দেওয়ার নামে প্রতারণা ও অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে মো. টিটো হোসেন নামের এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে। একই সঙ্গে তার বিরুদ্ধে চিকিৎসক হিসেবে ব্যবহৃত প্যাডে পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ার রেজিস্ট্রেশন নম্বর ব্যবহার করে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
অভিযোগকারী শত্রুজিৎপুর গ্রামের রাজ্জাক ফকিরের ছেলে হোসেন ফকির (৩৫) পেশায় একজন ভ্যানচালক। গত ১০ আগস্ট মুখের চোয়াল বাঁকা হয়ে যাওয়ার সমস্যা নিয়ে তিনি শত্রুজিৎপুর ল্যাব মেডিকেল ডায়াগনস্টিক সেন্টারে টিটো হোসেনের কাছে চিকিৎসা নিতে যান। এরপর বিভিন্ন পরীক্ষা, ওষুধ ও ইনজেকশনের কথা বলে তার কাছ থেকে প্রায় ১৭ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
হোসেন ফকিরের দাবি, প্রথমে তাকে টিটো হোসেনের প্যাডে ও পরে সাদা কাগজে ওষুধের নাম লিখে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে মানব অ্যালবুমিন ২০ শতাংশের দুটি ইনজেকশন দেওয়া হয়, যার দাম মোট ৯ হাজার টাকা বলে তাকে জানানো হয়। এছাড়া বিভিন্ন খরচ বাবদ তার কাছ থেকে আরও টাকা নেওয়া হয়।
অভিযোগ অনুযায়ী, রোগীকে নরসিংদীর রওশন জেনারেল প্রাইভেট হাসপাতাল থেকে কয়েকটি পরীক্ষা করানোর কথা বলা হয়। এসব পরীক্ষার জন্য ৫ হাজার ৫০০ টাকা ব্যয় হয়েছে বলে টিটো হোসেন দাবি করেন। তার ভাষ্য, রোগীর হৃদ্যন্ত্রজনিত জটিলতা সন্দেহ হওয়ায় এসব পরীক্ষা করানো প্রয়োজন ছিল।
হোসেন ফকির বলেন, চিকিৎসা নেওয়ার পর তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে গত ১৩ আগস্ট তিনি মাগুরা শহরের একটি বেসরকারি ডায়াগনস্টিক প্রতিষ্ঠানে এমবিবিএস চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. এম এম এহসানুল হককে দেখান। সেখানে ৭৫০ টাকার ওষুধ দেওয়া হয় এবং ওই ওষুধ সেবনের পর তিনি সুস্থ বোধ করছেন বলে দাবি করেন। তিনি চিকিৎসার নামে নেওয়া অর্থ ফেরতসহ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার দাবি করেছেন।
এদিকে গত ১৬ আগস্ট দুপুরে শত্রুজিৎপুর ল্যাব মেডিকেল ডায়াগনস্টিক সেন্টারে রোগী হোসেন ফকির ও টিটো হোসেনের মধ্যে কথা কাটাকাটির ঘটনা ঘটে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। এ সময় টিটো হোসেন রোগী ও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করার কথা বলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অন্যদিকে অভিযোগের বিষয়ে টিটো হোসেন বলেন, তিনি রোগীকে সঠিক চিকিৎসা দিয়েছেন। তার দাবি, তিনি ডিএমএফ এবং জেনারেল ফিজিশিয়ান হিসেবে চিকিৎসাসেবা দিয়ে আসছেন। রোগীর বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন ছিল বলেও তিনি দাবি করেন।
তবে অনুসন্ধানে টিটো হোসেনের শিক্ষাগত যোগ্যতা ও রেজিস্ট্রেশন নম্বর নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অনুসন্ধানকারীদের দাবি, বাংলাদেশ রাষ্ট্রীয় চিকিৎসা অনুষদের অধীনে ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষে ডিপ্লোমা ইন মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট ট্রেনিং কোর্সের তৃতীয় বর্ষের পরীক্ষায় টিটো হোসেন অংশ নেন। তার রোল নম্বর ১৯০৩ এবং রেজিস্ট্রেশন নম্বর ৪৪৯১১ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
অনুসন্ধান সংশ্লিষ্টদের দাবি, ২০২৬ সালের ২৯ জানুয়ারি প্রকাশিত ফলাফলে টিটো হোসেন কয়েকটি বিষয়ে অকৃতকার্য হন। এর মধ্যে বেসিক সার্জারি, বেসিক গাইনোকলজি অ্যান্ড অবস্টেট্রিক্স এবং বেসিক কমিউনিটি মেডিসিন অ্যান্ড হেলথ ম্যানেজমেন্ট বিষয় রয়েছে বলে তারা দাবি করেন। এরপরও প্রেসক্রিপশন প্যাডে ওই রেজিস্ট্রেশন নম্বর ব্যবহার করে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
এ বিষয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনা দেখা দিয়েছে। তারা অভিযোগটির নিরপেক্ষ তদন্ত করে টিটো হোসেনের শিক্ষাগত যোগ্যতা, পেশাগত নিবন্ধন, চিকিৎসা দেওয়ার বৈধতা এবং রোগীর কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার বিষয়টি যাচাই করার দাবি জানিয়েছেন।
শত্রুজিৎপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মুফতি ওসমান গনি মুছাপুরী বলেন, অভিযোগের বিষয়টি তার নজরে এসেছে। তিনি খোঁজ নিয়ে জানতে পেরেছেন, শত্রুজিৎপুর ল্যাব মেডিকেল ডায়াগনস্টিক সেন্টারে তালা দেওয়া হয়েছে। তার কাছে স্থানীয় কয়েকজনও এ বিষয়ে অভিযোগ করেছেন। বিষয়টি নিয়ে তিনি মাগুরা প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলবেন বলে জানান।
স্থানীয়দের দাবি, চিকিৎসাসেবার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কোনো অনিয়ম বা প্রতারণার অভিযোগ থাকলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুত তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
তবে অভিযোগগুলোর সত্যতা ও টিটো হোসেনের চিকিৎসা দেওয়ার বৈধতা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের মাধ্যমেই চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত হবে।