October 2, 2026, 5:12 pm
শিরোনামঃ
যবিপ্রবির সাবেক উপাচার্যসহ ৭ জনের বিরুদ্ধে ২ মামলার দুদকের অনুমোদন যশোরের শার্শায় পুলিশি অভিযানে আওয়ামী লীগ কর্মী আটক মাগুরার শতখালী মাদরাসার সুপারের বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ ; তদন্তের দাবি যশোরে কৃষকের লাশ উদ্ধার‌ ; পরিবারের অভিযোগ হত্যা  যশোরের শার্শায় তৃণমূল আওয়ামী লীগের ৩ নেতাকর্মী গ্রেপ্তার যশোরের বাঘারপাড়া পৌর ছাত্রলীগের সভাপতিসহ দুইজন আটক মাগুরা বুনাগাতী ডিগ্রি কলেজে সংস্কৃতি মন্ত্রীকে সংবর্ধনা রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি আসা নিয়ে কোনো সংকট নেই : তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী দেশকে মরুভূমির হাত থেকে রক্ষায় খাল খননের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার : পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী আগামী ৩ মাসের মধ্যে কিশোর গ্যাং উৎখাত করা হবে : চিফ হুইপ
এইমাত্রপাওয়াঃ

মাগুরার শতখালী মাদরাসার সুপারের বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ ; তদন্তের দাবি

ফারুক আহমেদ, মাগুরা জেলা প্রতিনিধি : মাগুরার শালিখা উপজেলার শতখালী ইউনিয়নের শতখালী দারুল উলুম দাখিল মাদরাসার সুপার মাওলানা মো. হাফিজুর রহমানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম, দুর্নীতি, অর্থ আত্মসাৎ, শিক্ষক অনুপস্থিতি ও প্রক্সির মাধ্যমে ক্লাস পরিচালনাসহ নানা অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের তদন্ত চেয়ে মাগুরা জেলা প্রশাসক, শালিখা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার, দুর্নীতি দমন কমিশন ও বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে।

 

অভিযোগকারীদের দাবি, ১৯৭৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এ মাদরাসাটিতে দীর্ঘদিন ধরে সুপার মাওলানা হাফিজুর রহমান এককভাবে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করে আসছেন। তিনি ১৯৯১ সালের ১৮ জুলাই থেকে সুপার পদে দায়িত্ব পালন করছেন। অভিযোগ রয়েছে, নিয়ম অনুযায়ী প্রতিদিন শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের কথা থাকলেও তিনি নিয়মিত ক্লাস নেন না এবং দীর্ঘদিন ধরে সকাল ১০টা থেকে ১১টার মধ্যে মাদরাসা ত্যাগ করেন।

 

সরেজমিনে ১৪ সেপ্টেম্বর মাদরাসায় গিয়ে প্রায় তিন ঘণ্টা অবস্থান করেও সুপারকে পাওয়া যায়নি বলে জানা গেছে। পরবর্তী কয়েকদিনেও তিনি নিয়মিত পুরো সময় প্রতিষ্ঠানে ছিলেন না বলে অভিযোগ রয়েছে।

 

অভিযোগে আরও বলা হয়, মাদরাসার কৃষি শিক্ষক শিল্পী দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত ক্লাস না নিয়ে প্রক্সির মাধ্যমে দায়িত্ব পালন করেছেন। অভিযোগকারীদের দাবি, ২০২২ সাল থেকে ২০২৬ সালের ৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তার পরিবর্তে সোহাগ নামে একজনকে দিয়ে ক্লাস নেওয়া হয়েছে। শিক্ষক হাজিরা খাতায় সুপার নিজে স্বাক্ষর করার পাশাপাশি শিক্ষক শিল্পী মাঝে মধ্যে এসে স্বাক্ষর করে চলে যেতেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।

সহকারী সুপার মনিরুজ্জামানের শারীরিক অসুস্থতার সুযোগে তার ছেলে শাকিবকে দিয়ে প্রায় এক বছর প্রক্সি দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

এদিকে, মাদরাসার লাইব্রেরিয়ান পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে ১২ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে সুপারের বিরুদ্ধে। অভিযোগে বলা হয়েছে, এবতেদায়ী প্রধান শিক্ষক আমিনুর রহমানের ছেলের জন্য ওই টাকা নেওয়া হয়। তবে এ বিষয়ে কথা বলতে গেলে সুপার মোবাইল ফোনে দাবি করেন, আমিনুর রহমানের ভাইদের সঙ্গে তার কিছুটা মনোমালিন্য হয়েছিল।

মাদরাসার ব্যবস্থাপনা কমিটি নিয়েও জটিলতার অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, নিয়ম অনুযায়ী কমিটি গঠন না হওয়া নিয়ে আদালতে মামলা চলমান রয়েছে।

পাঁচ লাখ টাকার সরকারি অনুদান নিয়ে প্রশ্ন

পারফরমেন্স বেজড গ্র্যান্টস ফর সেকেন্ডারি ইন্সটিটিউশনস প্রকল্পের আওতায় ২০২২-২৩ অর্থবছরে মাদরাসাটিতে ব্যবস্থাপনা জবাবদিহি অনুদান হিসেবে পাঁচ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, শিক্ষক প্রণোদনা খাতে এক লাখ টাকা বরাদ্দের বিপরীতে প্রায় ৮০ হাজার টাকা শিক্ষকদের মধ্যে দেওয়া হয়েছে। তবে বইপত্র ও লাইব্রেরি, শিক্ষা উপকরণ ও গবেষণাগার সরঞ্জাম ক্রয়, শিক্ষার্থীদের জন্য বিশুদ্ধ পানি, পৃথক শৌচাগার ও কমনরুম উন্নয়ন, সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের সহায়তা এবং প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের সুবিধা উন্নয়নসহ অন্যান্য খাতে বরাদ্দের অর্থ যথাযথভাবে ব্যয় করা হয়নি।

প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের সুবিধা উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ ৫০ হাজার টাকা এবং সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের সহায়তার ৭৫ হাজার টাকা নিয়েও অনিয়মের অভিযোগ করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, এসব খাতে প্রকৃত ব্যয় ও নথিপত্র তদন্ত করা প্রয়োজন।

 

এছাড়া মাদরাসায় ফ্যান, কমনরুম, মেয়েদের শৌচাগার ও পানির ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের দেওয়া ফ্যানের হিসাব এবং মাদরাসার ব্যয় দেখানো হয়েছে কি না, সেটিও তদন্তের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।

জমি, পুকুর ও গাছের অর্থ নিয়েও অভিযোগ

মাদরাসার মাঠের প্রায় ৪৫ থেকে ৫৫ শতক জমি লিজ দিয়ে বছরে প্রায় ২০ হাজার টাকা এবং ধান পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। মাদরাসার পুকুর এক লাখ টাকায় এবং পুকুরের বিভিন্ন পাড় পৃথক ব্যক্তির কাছে লিজ দেওয়ার কথাও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

 

এছাড়া মাদরাসা প্রাঙ্গণের কাঁঠাল ও মেহগনি গাছ বিক্রি এবং গাছ কাটার পর ওই স্থানে নির্মাণকাজ করার অভিযোগ উঠেছে। মাগুরা জেলা পরিষদের অর্থায়নে মাদরাসার পশ্চিম পাশে বরাদ্দ করা এক লাখ টাকা এবং শিক্ষকদের মধ্যে ৮০ হাজার টাকা বিতরণের বিষয়েও তদন্ত দাবি করা হয়েছে।

পরীক্ষার ফি ও শিক্ষার্থী সহায়তা নিয়ে অভিযোগ

অভিযোগকারীদের দাবি, ২০২৬ সালের দাখিল পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে তিন হাজার ৭০০ টাকা এবং মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে তিন হাজার ৫০০ টাকা নিয়ে ফরম পূরণ করানো হয়েছে।

২০২৬ সালে এ মাদরাসা থেকে ১৯ জন শিক্ষার্থী দাখিল পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ১৩ জন উত্তীর্ণ এবং ছয়জন অনুত্তীর্ণ হয়েছে বলে জানা গেছে।

নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী মিথিলাকে পাঁচ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে বলে সাংবাদিকদের সামনে বক্তব্য দেওয়ানোর অভিযোগও উঠেছে। তবে মিথিলার মা লাকী বেগম দাবি করেছেন, তার মেয়েকে মাদরাসা থেকে পাঁচ হাজার টাকা দেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, কয়েক বছর আগে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময় তার মেয়ে এক হাজার ৫০০ টাকা উপবৃত্তি পেয়েছিল। এ বিষয়ে তার কাছে মুঠোফোনে কথোপকথনের রেকর্ড রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।

অভিযোগকারীদের আরও দাবি, মিথিলাকে সাংবাদিকদের সামনে বক্তব্য দেওয়ার জন্য প্রস্তুত করেছিলেন মাদরাসার নৈশপ্রহরী জাহাঙ্গীর। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

নিয়োগ ও শিক্ষাগত সনদ নিয়েও অভিযোগ

মাদরাসার এক সহকারী শিক্ষকের এইচএসসি সনদে তৃতীয় বিভাগ থাকার পর চাকরির ক্ষেত্রে দ্বিতীয় বিভাগের নকল বা পরিবর্তিত সনদ ব্যবহারের অভিযোগ করা হয়েছে। বিষয়টি তদন্ত করে সঠিকতা যাচাইয়ের দাবি জানানো হয়েছে।

এছাড়া মাদরাসার নিবন্ধিত শিক্ষকদের কাছ থেকে সিসি ক্যামেরা কেনার টাকা নেওয়া, সুপারের কার্যালয়ে কাচের ব্যবস্থা করতে ৬০ হাজার টাকা নেওয়া, সংস্কার ও রংয়ের কাজে কর্মরত কর্মচারীদের পারিশ্রমিক না দেওয়া এবং সরকারি জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত পাঁচ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে।

প্রতিবছর সরকারি টিউশন ফি বাবদ অর্থ আসলেও তার হিসাব নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা। ২০২৬ সালে প্রায় ৬০ হাজার টাকা আসার কথা উল্লেখ করে ওই অর্থের ব্যবহার তদন্তের দাবি করা হয়েছে।

অভিভাবকদের অভিযোগ

মাদরাসার অভিভাবক সদস্য আসাদুল শিকদার, আসিফ শিকদার, ওয়াদুদ বিশ্বাস, সিদ্দিকুর রহমান, বশির তরফদার, নাজমুল শিকদার, ফখরুল ইসলাম, আতিয়ার মোল্লা, আনোয়ার হোসেন ও নাজিমসহ স্থানীয় কয়েকজন অভিযোগ করেন, সুপার মাওলানা হাফিজুর রহমান এককভাবে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছেন।

তাদের দাবি, মাদরাসার আয়-ব্যয়, শিক্ষক উপস্থিতি, সরকারি অনুদান, জমি-পুকুর লিজ, নিয়োগ এবং অন্যান্য আর্থিক কর্মকাণ্ড তদন্ত করতে একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করা হলে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসবে।

তারা অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সুপার শতখালী ইউনিয়ন ওলামা লীগের সভাপতি ছিলেন এবং তখন রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করেছেন। তবে এ রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগের স্বাধীন যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

সুপারের বক্তব্য

অভিযোগের বিষয়ে শতখালী দারুল উলুম দাখিল মাদরাসার সুপার মাওলানা মো. হাফিজুর রহমান মুঠোফোনে বলেন, কৃষি শিক্ষক শিল্পী নিয়মিত মাদরাসায় আসেন এবং তিনি হার্টের অপারেশন করা রোগী ও অসুস্থ। তার কিছু ক্লাস অন্য কেউ নেন বলেও জানান তিনি।

 

তবে তার বিরুদ্ধে ওঠা সরকারি বরাদ্দের অর্থ ব্যয়, শিক্ষক প্রক্সি, নিয়োগে অর্থ গ্রহণ, জমি-পুকুর লিজ ও অন্যান্য অভিযোগের বিষয়ে বিস্তারিত বক্তব্য না দিয়ে তিনি বিষয়গুলো অস্বীকার করেন বলে অভিযোগকারীরা জানিয়েছেন।

 

১৪ সেপ্টেম্বর মাদরাসায় গিয়ে প্রায় তিন ঘণ্টা অপেক্ষা করেও সুপারকে পাওয়া যায়নি।

 

অভিযোগকারীদের দাবি, বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা শুরু হওয়ার পর সুপার কয়েকজন সাংবাদিককে ডেকে পাঁচ লাখ টাকার বরাদ্দের মধ্যে শিক্ষক খাতে ৮০ হাজার টাকা দেওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেন। তবে পাঁচ লাখ টাকার অন্যান্য খাতের ব্যয়ের হিসাব, নথিপত্র ও সরেজমিন কাজ দেখানো হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

 

কর্মকর্তারা যা বললেন

 

শালিখা উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মো. আব্দুল গনি বলেন, “শতখালী দারুল উলুম দাখিল মাদরাসার সুপারের বিরুদ্ধে অভিযোগটি শুনলাম। বিষয়টি আমি দেখছি।”

 

মাগুরা জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মোহাম্মদ সহীলুদ্দীন বলেন, “অভিযোগের বিষয়টি মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে অবহিত করে ব্যবস্থা নিতে বলব। একই সঙ্গে শালিখা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকেও বিষয়টি জানানো হবে।”

 

শালিখা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তানভীর হাসান চৌধুরী বলেন, “শতখালী দারুল উলুম দাখিল মাদরাসার বিষয়টি জানলাম।”

 

মাগুরা জেলা প্রশাসক মোতাকাব্বীর আহমেদ সাংবাদিক ফারুক আহমেদকে বলেন, “লিখিত অভিযোগ দেন, ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

 

অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষ তদন্ত হলে প্রকৃত ঘটনা, সরকারি বরাদ্দের অর্থের ব্যবহার, শিক্ষক উপস্থিতি, নিয়োগ প্রক্রিয়া এবং প্রতিষ্ঠানের সম্পদ ব্যবস্থাপনার বিষয়গুলো স্পষ্ট হবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

আজকের বাংলা তারিখ

October ২০২৬
Mon Tue Wed Thu Fri Sat Sun
« Sep    
 ১২৩৪
৫৬৭৮৯১০১১
১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৮২৯৩০৩১  


Our Like Page