ফারুক আহমেদ, মাগুরা : মাগুরার শালিখা উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার (ইউইও) বিরুদ্ধে আবারও নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। শিক্ষক সংস্করণ বই আনার নামে উপজেলার ২৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে জনপ্রতি ৫০ টাকা আদায়, জিপিএফ হিসাব খুলতে অর্থ দাবি, প্রাক-প্রাথমিক বই ও বিভিন্ন প্রশাসনিক কাজের নামে টাকা নেওয়াসহ একাধিক অভিযোগ করেছেন শিক্ষকরা।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, গত ৯ জুলাই উপজেলার ২৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শিক্ষক সংস্করণ বই আনার কথা বলে ৫০ টাকা করে নেওয়া হয়। এছাড়া ২০২৪ সালে নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকদের জিপিএফ হিসাব খুলে দেওয়ার জন্য ২ হাজার টাকা এবং ২০২৫ সালে প্রাক-প্রাথমিক বই আনার খরচ বাবদ ১০০ টাকা করে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
শিক্ষকদের অভিযোগ, মেডিকেল বিল, মাতৃত্বকালীন ছুটি, বিদেশ গমন, জিপিএফ ঋণ, শ্রান্তি বিনোদন ভাতা, স্লিপ বরাদ্দ, প্রাক-প্রাথমিক বরাদ্দ, পেনশন ফাইলসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক কাজ সম্পন্ন করতে অর্থ দাবি করা হতো। অর্থ দিতে অস্বীকৃতি জানালে ফাইল আটকে রাখা, শোকজ প্রদান এবং বিভিন্নভাবে হয়রানি করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তারা।
দড়িশলই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মাহমুদা, বুনাগাতী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নাজমুন নাহার, শিক্ষক ভৈরব বিশ্বাস ও হিসাব সহকারী সমীর বিশ্বাসসহ একাধিক ব্যক্তি লিখিত অভিযোগে এসব তথ্য তুলে ধরেছেন।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, অফিসের পিয়ন রকিব হোসেন ঘুষ আদায়ে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করতেন। ২০২৬ সালে শতাধিক শিক্ষকের শ্রান্তি বিনোদন ভাতার বিল দীর্ঘদিন আটকে রেখে পরে জনপ্রতি ৫০০ টাকা নেওয়ার পর বিল নিষ্পত্তি করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
উপজেলা হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তার ২৮ এপ্রিল ২০২৬ তারিখের এক চিঠিতে শ্রান্তি বিনোদন ভাতার বিলে স্বাক্ষরের ঘাটতি, ব্যাকডেটে স্বাক্ষর এবং বিধিবহির্ভূত ছুটি অনুমোদনের বিষয় উল্লেখ করে বিল ফেরত পাঠানো হয়।
এদিকে, জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখের এক চিঠিতে সরকারি নীতিমালা উপেক্ষা করে কয়েকজন শিক্ষককে মৌখিকভাবে ডেপুটেশন দেওয়ার বিষয়ে ইউইওর কাছে কৈফিয়ত চাওয়া হয় এবং ডেপুটেশনপ্রাপ্ত শিক্ষকদের তালিকা তলব করা হয়।
একাধিক শিক্ষক অভিযোগ করেন, শিশুদের পুষ্টি কর্মসূচির আওতায় বিদ্যালয়ে বরাদ্দকৃত দুধও বিভিন্ন বিদ্যালয় থেকে সংগ্রহ করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, খাটুরা রামানন্দকাটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে ৪০ প্যাকেট এবং শালিখা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে ৫৫ প্যাকেট দুধ নেওয়া হয়। পরে বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নজরে আনা হয়েছে বলে দাবি করেন অভিযোগকারীরা।
এছাড়া যারা ঘুষ দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন বা অনিয়মের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন, তাদের বিরুদ্ধে শোকজ, ঘন ঘন বিদ্যালয় পরিদর্শন এবং প্রশাসনিক চাপ প্রয়োগের অভিযোগও রয়েছে। পুকুরিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক সবুজ আলী ও প্রধান শিক্ষক সোলায়মানের ক্ষেত্রেও এমন অভিযোগের নথি রয়েছে বলে জানা গেছে।
উপজেলা শিক্ষা অফিসের হিসাব সহকারী সমীর কুমারের ২৩ মে ২০২৬ তারিখের এক লিখিত আবেদনে উল্লেখ করা হয়, অফিস চলাকালে কয়েকজন শিক্ষক তার সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন এবং শারীরিকভাবে হেনস্তার চেষ্টা করেন। তিনি অভিযোগ করেন, পুরো ঘটনার সময় ইউইও উপস্থিত থাকলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেননি।
শিক্ষকদের আরও অভিযোগ, স্লিপ বরাদ্দের বিল পাসে প্রতি বিদ্যালয় থেকে ৬০০ টাকা এবং প্রাক-প্রাথমিক বরাদ্দের জন্য ৪০০ টাকা করে নেওয়া হতো। এছাড়া পেনশন ও জিপিএফ উত্তোলনসহ বিভিন্ন আর্থিক কার্যক্রমেও ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, শালিখা উপজেলার অন্তত ১০ জন শিক্ষক প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। তারা অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
জেলা সহকারী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আবু হেনা মোস্তফা কামাল বলেন, “তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা রুজু হয়েছে।”
অভিযোগের বিষয়ে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোসা. হেনায়ারা খানম বলেন, “আমার বিরুদ্ধে আনীত সব অভিযোগ মিথ্যা।”
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহিনা ফেরদৌস বলেন, “বিষয়টি আমরা অবগত আছি।”
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. সাখওয়াত হোসেন বলেন, “শালিখা উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়ে ইউইও হেনায়ারা খানমের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা রয়েছে এবং বিষয়টি বিচারিক প্রক্রিয়াধীন।”
এ বিষয়ে শালিখা উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোসা. হেনায়ারা খানমের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তাকে অফিসে পাওয়া যায়নি। পরে মোবাইল ফোনে তিনি জানান, তিনি জেলা শিক্ষা অফিসে যাচ্ছেন। কখন অফিসে ফিরবেন, সে বিষয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারেননি।